যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত মাসেই যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আশার আলো দেখা গিয়েছিল, মঙ্গল ও বুধবারের পাল্টাপাল্টি হামলা সেই সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিয়েছে। এমনকি দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটির (এমওইউ) ভবিষ্যৎও এখন এক বড় ধরনের হুমকির সম্মুখীন, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
যদিও নতুন করে বড় ধরনের হামলার খবর পাওয়া যায়নি, তবুও পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন যে, আপাতদৃষ্টিতে কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও, প্রয়োজন হলে হামলা চালাতে মার্কিন বাহিনী সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত। একই দিনে আরব সাগরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে থাকা যুদ্ধবিমানগুলোতে অস্ত্রশস্ত্র সাজাতে দেখা যায় এবং এর পাইলটরাও সম্ভাব্য আক্রমণের জন্য মহড়া পরিচালনা করেন। এই প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ওয়াশিংটনের দৃঢ় সামরিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের এই কঠোর মনোভাব পরে গত শুক্রবার দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যে আরও স্পষ্ট হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, “ইরান আমাদের কাছে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছে। আমরা তাতে সম্মত হয়েছি। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধবিরতি এখন শেষ।” ট্রাম্পের এই বার্তা একদিকে যেমন আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দেয়, তেমনই অন্যদিকে ইরানের প্রতি তার কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত হলেও, সামরিক চাপ বজায় রাখতে কুণ্ঠাবোধ করবে না।
এই বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে সমঝোতা স্মারকটি পুনরুজ্জীবিত করা এখনও সম্ভব। ব্রিটিশ চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘রুসি’র জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল স্টিফেনস আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকটি এখনো টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তবে এ জন্য অনেক কাজ করতে হবে এবং উভয় পক্ষকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”
স্টিফেনস বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের যুক্তি শুনতে চাইছে না।” তিনি মনে করেন, কূটনীতিকে সফল করার সুযোগ দিতে হলে কাউকে না কাউকে এই অচলাবস্থা ভাঙতে এগিয়ে আসতে হবে। এই মন্তব্যের মাধ্যমে স্টিফেনস উভয় পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান অনাস্থা এবং যোগাযোগের অভাবের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা যেকোনো শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য মারাত্মক বাধা।
সমঝোতা স্মারকের ভাষা বা শর্তাবলির কারণেই এই সশস্ত্র সংঘাত অনেকটা অনুমিত ছিল বলে জানান স্টিফেনস। তিনি বিশ্লেষণ করে বলেন, চুক্তির একদম শুরুর দিকে ইরান বেশ কিছু সুবিধা আদায় করে নিয়েছিল, যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে। আর এতেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়। এটি চুক্তির অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অসঙ্গতির দিকে আলোকপাত করে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক দেখছেন মাইকেল স্টিফেনস। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, এত উত্তেজনা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম খুব একটা বাড়েনি। স্টিফেনস বলেন, “তেলের দাম লাফিয়ে না বাড়ার অর্থ হলো বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই সংকট সমাধানের পথ আছে। তাঁরা হয়তো বিশ্বাস করেন যে এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে না।” এটি আন্তর্জাতিক বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, যা ইঙ্গিত দেয় যে, বড় আকারের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা এখনও কম।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহু পুরনো শত্রুতা এবং পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার পর থেকে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের “সর্বোচ্চ চাপ” নীতির কারণে দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতি হয়। এই প্রেক্ষাপটে, যেকোনো সমঝোতা স্মারক বা শান্তি প্রক্রিয়া অত্যন্ত ভঙ্গুর থাকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্বের উক্তি, যেমন “ইরানের হাতে হত্যার শিকার হলে করণীয় কী হবে”, তার প্রশাসনের কঠোর মনোভাবের প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে, কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতিও জারি রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সাথে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপ বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
