ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে ভারত আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার এই বক্তব্য কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে খোদ তাঁর নিজের দলের ভেতরেই রয়েছে গভীর সংশয়। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি এই ফেরার কথা জানানোর পাশাপাশি নির্বাসনে থাকা দলীয় নেতাকর্মীদেরও দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান বাস্তবতায় এটি সাংগঠনিক প্রস্তুতির চেয়ে বরং দলের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার একটি কৌশল হতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অসংখ্য হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার রায় দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ভারতের প্রতি আনুষ্ঠানিক আহ্বানও জানিয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাটি আইনি জটিলতাকে আরও ঘনীভূত করেছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন স্পষ্ট করেছেন যে, সরকার পুরো বিষয়টি আইনের দৃষ্টিতে দেখছে এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় তাঁর বক্তব্য প্রচার বা নৈরাজ্য সৃষ্টির যেকোনো প্রচেষ্টাকে সরকার গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, গত বছরের মে মাসে দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীরা চরম ছত্রভঙ্গ অবস্থায় আছেন। অনেকে আত্মগোপনে আছেন, আবার অনেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশে ফেরার মতো ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা বা সাংগঠনিক সক্ষমতা এখন দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীর নেই বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলের অনেক সিনিয়র নেতা মনে করছেন, এটি কেবল একটি প্রতীকী ঘোষণা হতে পারে, যার মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্তিত্বের জানান দেওয়া এবং দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চাপ সৃষ্টি করাই মূল উদ্দেশ্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণও থাকতে পারে। বিশেষ করে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তিনি বিচারব্যবস্থাকে প্রহসন আখ্যা দিয়ে নিজের অবস্থানে অটল থাকলেও, অতীতের দায় স্বীকার বা দুঃখ প্রকাশের কোনো লক্ষণ না থাকায় জনমনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, ডিসেম্বরে ফেরার এই ঘোষণাটি বাস্তবিক কোনো কর্মপরিকল্পনার চেয়ে বরং রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটি কৌশলগত চাল হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
