বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও বর্তমানে এটি এক গভীর কাঠামোগত ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের প্রায় ৫৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকার ঋণ এবং ক্রমবর্ধমান পুঞ্জীভূত লোকসান প্রমাণ করে যে, কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই টেকসই সমাধানের পথ নয়। বরং বিদ্যমান সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং একে আরও স্মার্ট ও জবাবদিহিমূলক করে তোলাই এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতকে শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার সুযোগ নেই; কারণ এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পায়ন, কৃষি ও ডিজিটাল অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় এখন পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সময় এসেছে। যখনই গ্রিডের সক্ষমতায় ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই নতুন সঞ্চালন লাইন বা সাবস্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব উঠে আসে। অথচ, তথ্যপ্রযুক্তি, সেন্সর এবং স্মার্ট অপারেশনের মাধ্যমে বিদ্যমান অবকাঠামো থেকেই অনেক বেশি কার্যকারিতা পাওয়া সম্ভব। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট সঞ্চালন সক্ষমতা থাকলেও সিস্টেম লস ৩.৩১ শতাংশে পৌঁছানো এবং সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না হওয়া নির্দেশ করে যে, পরিকল্পনায় বড় ধরনের অদক্ষতা রয়েছে। শুধু ‘হুইলিং চার্জ’ বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।
আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মূল চাবিকাঠি হলো ‘স্মার্ট গ্রিড’। এর মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ডাটা বিশ্লেষণ করে কোন পথে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে সঞ্চালন ক্ষতি কম হবে এবং ভোল্টেজ স্থিতিশীল থাকবে, তা নিশ্চিত করা যায়। গুগল ম্যাপের মতো ‘ট্রান্সমিশন টপোলজি অপ্টিমাইজেশন’ সফটওয়্যার ব্যবহার করে চাপের মুখে থাকা লাইন থেকে বিদ্যুৎ সরিয়ে কম ব্যবহৃত লাইনে স্থানান্তর করা সম্ভব। এছাড়া ‘ডাইনামিক লাইন রেটিং’ (ডিএলআর) পদ্ধতি ব্যবহার করে আবহাওয়া ও তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে বিদ্যমান লাইনের সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে নতুন লাইনের প্রয়োজনীয়তা বিলম্বিত করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা ও এর আশপাশের শিল্পাঞ্চলকে নিয়ে একটি পাইলট প্রজেক্ট শুরু করা যেতে পারে। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে ‘ডিমান্ড রেসপন্স’ বা চাহিদা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি কার্যকর করা সম্ভব। পিক আওয়ারে শিল্পকারখানায় অ-প্রয়োজনীয় লোড কমিয়ে গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং এর বিনিময়ে গ্রাহকদের প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা চালু করলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়বে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তিগত সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অপরিহার্য। বড় প্রকল্প মানেই আমদানিনির্ভর যন্ত্রপাতি ও দুর্নীতির সুযোগ—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে কারিগরি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতকে ঢেলে সাজানোই এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
