পুরান ঢাকার চকবাজারের সোয়ারীঘাট এলাকায় একটি প্লাস্টিক কারখানায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক তরুণ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এমদাদুল হক (২৫) নামের ওই শ্রমিক বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সন্ধ্যায় একটি মেশিন চালু করতে গিয়ে এই দুর্ঘটনার শিকার হন। তাৎক্ষণিকভাবে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও কর্তব্যরত চিকিৎসক সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনা আবারও দেশের শিল্প খাতে শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
নিহত এমদাদুলকে হাসপাতালে নিয়ে আসা সহকর্মী বিপ্লব জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে ওই প্লাস্টিক কারখানায় মেশিন চালু করার সময় এমদাদুল আকস্মিকভাবে বিদ্যুতের সংস্পর্শে আসেন। বিদ্যুতায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ঘটনাস্থলে অচেতন হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়, কিন্তু চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এমদাদুলের অকাল মৃত্যু তার পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ বক্সের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মোহাম্মদ ফারুক চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে এমদাদুলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর সঠিক কারণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য আরও স্পষ্ট হবে। সংশ্লিষ্ট থানাকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়ে অবগত করা হয়েছে এবং পুলিশ পরবর্তী আইনানুগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নিহত এমদাদুল হকের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায় হলেও তিনি বর্তমানে চকবাজারের সোয়ারীঘাট এলাকাতেই বসবাস করতেন।
পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং শিল্প-ঘন এলাকায় ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানায় এমন দুর্ঘটনা নতুন নয়। বিশেষ করে প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন প্রায়শই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এসব কারখানায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার, অরক্ষিত বিদ্যুৎ সংযোগ এবং শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে, উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য মালিকপক্ষ নিরাপত্তা মানদণ্ড উপেক্ষা করে, যার ফলে শ্রমিকরা অকালে প্রাণ হারান বা গুরুতর আহত হন, যা শ্রম আইন ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনাগুলো কর্মস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর তদারকি এবং আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতিটি কারখানায় শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের দায়িত্ব। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এর মতো সংস্থাগুলোর নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে নিরাপত্তা মানদণ্ড বজায় রাখা এবং ত্রুটিপূর্ণ কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) সরবরাহ, নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করাও অপরিহার্য।
এমদাদুল হকের মতো তরুণ শ্রমিকদের অকাল মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নকেই ভেঙে দেয় না, বরং দেশের শ্রমশক্তির জন্যও এক বিশাল ক্ষতি। এই দুর্ঘটনা একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এমন জীবনহানি রোধ করা যায়। কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে শ্রমিকরা আরও নিরাপদে ও নির্ভয়ে কাজ করতে পারবেন এবং দেশ অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
