বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত চেয়ে ভারতকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সাথে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশের আদালতে আরও একটি নতুন হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে। এই দ্বিমুখী আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন—এমন সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০১৬ সালে সংশোধিত দ্বিপাক্ষিক বন্দি বিনিময় চুক্তি (Extradition Treaty)-র ধারাগুলো উল্লেখ করে এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু করার তাগিদ দিয়েছে ঢাকা। বিগত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্বিচারে গুলি বর্ষণের নির্দেশ দেওয়ার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আসাদুজ্জামান খান কামালকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় শতাধিক হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও জোরদার হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার একটি আদালতে তার বিরুদ্ধে আরও একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলন চলাকালীন রাজধানীর উত্তরা এলাকায় পুলিশের গুলিতে এক শিক্ষার্থীর নিহতের ঘটনায় এই মামলাটি রুজু করা হয়। মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে শেখ হাসিনাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতাকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। আন্দোলনের পর থেকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা ও গণহত্যার মামলার সংখ্যা ইতিমধ্যে কয়েক শত ছাড়িয়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফেরত চেয়ে পাঠানো এই আনুষ্ঠানিক চিঠি এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলমান মামলার পাহাড় ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই সেখানে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ইতিমধ্যে শেখ হাসিনাসহ পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে দ্বিপাক্ষিক বন্দি বিনিময় চুক্তির শর্ত মেনে অভিযুক্তদের ফেরত দিতে হবে কিনা, তা নিয়ে নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আইনি ও কৌশলগত জটিলতা তৈরি হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মতো উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ফেরত আনার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। যদি ভারত এই প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে, তবে তা দুই দেশের মধ্যকার বহুমাত্রিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ঢাকার বর্তমান প্রশাসন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বিচারের স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং পলাতক সমস্ত অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে সব ধরনের কূটনৈতিক প্রয়াস অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
