স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বের হয়ে যাওয়ার পর বৈশ্বিক বাণিজ্য সুবিধা আরও অন্তত তিন বছর বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ চাইছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করে এই সময়সীমা আরও তিন বছর, অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর জোরালো তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ এই দাবিটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছে। বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হলো, এলডিসি উত্তরণের পরও যাতে অন্তত তিন বছর শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা (DFQF) অব্যাহত থাকে, সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট এবং আইনিভাবে বাধ্যবাধকতামূলক সুপারিশ অর্জন করা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এক জটিল অর্থনৈতিক রূপান্তরকাল পার করছে। করোনা মহামারির ধাক্কা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের মতো অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে রপ্তানি খাতের বিশেষ সুবিধাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে দেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতসহ সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ অর্জন করে, তাই এই খাতের সক্ষমতা ধরে রাখতে অতিরিক্ত তিন বছরের এই রূপান্তরকালীন সময় (Transition Period) অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়া দেশগুলোর জন্য একটি মসৃণ ও টেকসই পথ (Smooth Transition Path) নিশ্চিত করা জাতিসংঘেরই অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। সে অনুযায়ী, ডব্লিউটিও-র বিভিন্ন মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলন ও পরবর্তী আলোচনাগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষ থেকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সুবিধা তিন বছর পর্যন্ত বহাল রাখার যে সাধারণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, বাংলাদেশ তার একটি সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর নেতারা মনে করেন, শুধু মৌখিক বা নীতিগত আশ্বাস নয়, বরং আমদানিকারক দেশগুলোর পক্ষ থেকে লিখিত ও সুনির্দিষ্ট ঘোষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইউ), যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে যাতে জিএসপি প্লাস বা সমমানের সুবিধা পেতে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত সময় পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি এই তিন বছরের সুনির্দিষ্ট সুপারিশটি আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত হয়, তবে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
পরিশেষে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, বিশ্বমঞ্চে এই দাবি আদায়ের জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা আবশ্যক। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের বোঝাতে হবে যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল এই অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশই পারে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক উত্তরণকে সফল ও টেকসই করতে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
