কক্সবাজারের চকরিয়া সুন্দরবন একসময় ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। কিন্তু গত শতকের শেষভাগে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, লবণ উৎপাদন এবং স্থানীয় ভূমিগ্রাসীদের দৌরাত্ম্যে এই সমৃদ্ধ বনাঞ্চলটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় বনাঞ্চলের গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কি পারবে হারিয়ে যাওয়া এই চকরিয়া সুন্দরবনকে আবারও ফিরিয়ে আনতে? পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে বনের আংশিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হলেও, আগের সেই আদি রূপ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত দুরূহ ও চ্যালেঞ্জিং।
মাতামুহুরী নদীর মোহনায় অবস্থিত চকরিয়া সুন্দরবনের আয়তন ছিল প্রায় সাড়ে আট হাজার হেক্টর। এটি ছিল এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ম্যানগ্রোভ বন। তবে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের উদ্দেশ্যে সরকারের ভুল নীতি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে বনের জমি ইজারা দেওয়া শুরু হয়। বনের পর বন কেটে তৈরি করা হয় চিংড়ির ঘের। ফলে আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে এই সমৃদ্ধ বনাঞ্চলটি মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়, যা দেশের পরিবেশগত ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে পরিচিত।
বন উজাড় হওয়ার পর থেকে চকরিয়া ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে এই অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ ছিল প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় বা চকরিয়া সুন্দরবনের অনুপস্থিতি। ম্যানগ্রোভ বন না থাকায় এই উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির ক্ষয় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় কৃষিকাজ ও সুপেয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সাথে হারিয়ে গেছে হাজারো প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও জলজ জীববৈচিত্র্য।
পরবর্তী সময়ে বন বিভাগ বিভিন্ন মেয়াদে চকরিয়া সুন্দরবন এলাকায় নতুন করে ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, চিংড়ি ঘেরের কৃত্রিম বাঁধগুলোর কারণে নদীর জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ম্যানগ্রোভ বনের টিকে থাকার জন্য নিয়মিত জোয়ার-ভাটার লোনা ও মিঠা পানির মিশ্রণ অপরিহার্য। এছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এই জমিগুলো দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, চকরিয়া সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব হতে পারে কারণ দীর্ঘ সময় ধরে চিংড়ি চাষ ও লবণ উৎপাদনের ফলে মাটির উপরিভাগের উর্বরতা ও রাসায়নিক গঠনে বড় পরিবর্তন এসেছে। তবে সমন্বিত বৈজ্ঞানিক উদ্যোগের মাধ্যমে একটি বড় অংশকে পুনরায় সবুজ করে তোলা সম্ভব। এর জন্য প্রথমে চিংড়ি ঘেরের অবৈধ বাঁধগুলো অপসারণ করে জোয়ার-ভাটার পানি চলাচলের পথ উন্মুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ জনগণকে এই বনায়ন প্রক্রিয়ায় অংশীদার করতে হবে, যাতে বনের টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই মারাত্মক বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করতে চকরিয়া সুন্দরবন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
