Sunday , July 26 2026
Breaking News
বর্ষার নতুন রূপে প্রাণবন্ত চলনবিল: পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়ে মুখর বিলপাড়, বাড়ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বর্ষার নতুন রূপে প্রাণবন্ত চলনবিল: পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়ে মুখর বিলপাড়, বাড়ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বর্ষাকাল সমাগত হলেই বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিল এক ভিন্ন রূপে সেজে ওঠে, যা প্রতি বছরই অসংখ্য পর্যটককে মুগ্ধ করে। থই থই জলরাশি, হালকা বাতাসে জলের ঢেউয়ের মিতালি, আর সারি সারি নৌকার আনাগোনায় বিলপাড় পরিণত হয় এক উৎসবমুখর জনপদে। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কুন্দইল সেতু সংলগ্ন এলাকা বর্তমানে এই বর্ষার চিরচেনা আমেজে মুখরিত, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।

প্রতিদিন সিরাজগঞ্জ, নাটোর, বগুড়াসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত দর্শনার্থী চলনবিলের অপরূপ শোভা উপভোগ করতে ভিড় জমাচ্ছেন। কেউ এসেছেন নৌকা ভ্রমণে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে, কেউবা পরিবারের সদস্যদের সাথে নিরিবিলি অবকাশ যাপন করতে। আবার অনেকেই শুধু বর্ষার স্নিগ্ধ চলনবিলের এক ঝলক সৌন্দর্য দেখতে ছুটে আসছেন। প্রকৃতির এই অপার দান দেখতে ভিড় বাড়ায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও জমে উঠেছে।

তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে কুন্দইল সেতুর দিকে এগোতেই চোখে পড়ে বর্ষার চলনবিলের বিস্তীর্ণ রূপ। দীঘি সদগুণা এলাকা পেরিয়ে কামারশোন গ্রামে পৌঁছেই দেখা যায় নৌকার বিশাল ঘাট। এখানে ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকা থেকে শুরু করে ছোট ছোট ডিঙি নৌকাও ভাড়ায় পাওয়া যায়। নিয়মিত যাত্রী পারাপারের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ নৌকাভ্রমণেরও ব্যবস্থা রয়েছে। এই ঘাট থেকে কুন্দইল সেতু পর্যন্ত জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় যাতায়াত করা যায়, আর পুরো নৌকা ঘণ্টাপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকায় ভাড়া নেওয়া যায়।

নৌকা ঘাটে পা রাখতেই বোঝা যায়, বর্ষার আনন্দ উৎসবে মুখর হয়ে উঠেছে বিল। কেউ নেমে পড়েছেন স্বচ্ছ জলে গা ভেজাতে, কেউ বা মোটরবাইক থামিয়ে বিলের ধারে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। আবার অনেকে মাকড়শোন এলাকা পর্যন্ত যানবাহন নিয়ে এসে সেখান থেকে নৌকায় চড়ে বিলের গভীরে প্রবেশ করে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের ভিড়ে এই এলাকা যেন প্রাণচঞ্চল।

তাড়াশ সদর এলাকার চাকরিজীবী হারুনার রশিদ জানান, বর্ষায় বিলে পানি এলেই তিনি তাঁর মেয়েকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন। কুন্দইল সেতুর ঘাটে পৌঁছালে মনে হয় যেন বর্ষার আনন্দমেলা বসেছে চলনবিলে। ঘাটজুড়ে নৌকার সারি, ব্যস্ত মাঝিদের হাঁকডাক আর দর্শনার্থীদের পদচারণায় এক ভিন্ন আমেজ তৈরি হয়। সেতুর রেলিং থেকে অনেকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন আনন্দ উল্লাসে। কেউ তাঁদের মোবাইল ফোনে প্রকৃতির ছবি তুলছেন, কেউ বা ভিডিও করে স্মৃতির ফ্রেমে ধরে রাখছেন। আবার অনেকেই শুধু স্থির হয়ে বিলের বিশাল জলরাশি আর দিগন্তবিস্তৃত সবুজের মিতালি উপভোগ করছেন।

স্থানীয় মাঝি আবদুস সালাম বলেন, বর্ষা এলেই তাঁদের ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁদের যাত্রী পারাপার ও নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে হয়। এই বাড়তি আয় তাঁদের পরিবারে সারা বছরের জন্য কিছুটা স্বস্তি নিয়ে আসে। বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার ব্যবসায়ী ছোটন চক্রবর্তী তাঁর পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে চলনবিলে ঘুরতে এসেছেন। বাসযোগে সিংড়া পর্যন্ত এসে সেখান থেকে দুটি নৌকা ভাড়া করে তিনি বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। তিনি জানান, নৌকা ভ্রমণ আর চারপাশের মনোরম প্রকৃতি তাঁকে মুগ্ধ করেছে। ছোটনের মেয়ে, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী টুসু চক্রবর্তীর উচ্ছ্বাসও চোখে পড়ার মতো। সে জানায়, এই প্রথমবার সে চলনবিল দেখতে এসেছে এবং নৌকায় ভেসে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরে সে অত্যন্ত আনন্দিত।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা গেছে, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস চলনবিল ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। তবে বিলের পানির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্তও দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকে। চলতি বর্ষা মৌসুমে বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকায় এবং তাড়াশ সদর থেকে কুন্দইল পর্যন্ত সড়কের অবস্থার উন্নতি হওয়ায় পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সাথে বিলপাড়জুড়ে ভাজাপোড়া, চা ও ফলের অস্থায়ী দোকানগুলোতে মৌসুমী ব্যবসাও জমে উঠেছে। ভালো বিক্রির কারণে বিক্রেতারাও খুশি।

পর্যটকদের এই উপচেপড়া ভিড় চলনবিলকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা তুলে ধরছে। লেখক, গবেষক ও খুলনার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক খ ম রেজাউল করিম মনে করেন, চলনবিলের এই অংশকে ঘিরে যদি পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে এখানে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটতে পারে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

চলনবিলে ভ্রমণে আসা মানুষের সুবিধার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান। বর্ষার জল নামলেই চলনবিল যেন এক বিশাল জলরাজ্যে রূপান্তরিত হয়। সেই জলরাশির বুকে নৌকার দোল, মানুষের কোলাহল আর প্রকৃতির নৈকট্য প্রতি বছরই নতুন করে দেশ-বিদেশ থেকে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

এছাড়াও

লক্ষ্মীপুরকে কেন্দ্রে করে হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’: থাকছে বিশেষ গান, নাটকীয়তা ও মানবিক প্রতিবেদন

লক্ষ্মীপুরকে কেন্দ্রে করে হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’: থাকছে বিশেষ গান, নাটকীয়তা ও মানবিক প্রতিবেদন

দেশের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ তার ঐতিহ্যবাহী ফর্ম্যাট বজায় রেখে এবার লক্ষ্মীপুর জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *