কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জাসদের সদ্য পদত্যাগী নেতা আনোয়ারুল কবিরের ওপর দুর্বৃত্তরা এক নৃশংস ও সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। শুক্রবার রাতে ভেড়ামারা শহরের গোডাউন মোড় এলাকায় চা খাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় মোটরসাইকেলে আসা একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাঁকে লক্ষ্য করে ধারালো চাইনিজ কুড়াল দিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। এই রক্তক্ষয়ী হামলায় তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং ক্ষতস্থানে ১১টি সেলাই দিতে হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে রাজধানী ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে আনোয়ারুল কবির কয়েকজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে শহরের গোডাউন মোড়ের একটি চা দোকানে বসে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। হঠাৎ করে কয়েকটি মোটরসাইকেলে চেপে একদল দুর্বৃত্ত সেখানে উপস্থিত হয় এবং চাইনিজ কুড়ালসহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে আনোয়ারুল কবিরের মাথার পেছনের অংশে কোপ দেয়। ঘটনার সময় তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে সাথে থাকা দুলাল ও নুরু নামের আরও দুই ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। ঘটনার পরপরই উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা শেষে পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা সাবেক এই মেয়রকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন।
উল্লেখ্য যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আনোয়ারুল কবির তাঁর মেয়র পদ হারান। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) ভেড়ামারা উপজেলা কমিটির সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। পাশাপাশি তিনি জাতীয় যুব জোটের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং কুষ্টিয়া জেলা যুব জোটের সহ-সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তবে রাজনৈতিক নানা টানাপোড়েনের জেরে গত ২৯ জুন নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি জাসদের সমস্ত দলীয় পদ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। দলত্যাগের মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তাঁর ওপর এই পরিকল্পিত হামলা সংঘটিত হলো।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাবেক মেয়র আনোয়ারুল কবির অভিযোগ করেন, নওদাপাড়া এলাকার স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা এস এস আল হোসাইন সোহাগ এবং চাঁদগ্রাম এলাকার সিজারসহ বেশ কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এই হামলাটি চালিয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, রাজনৈতিক বিষোদগারের জেরে ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার রাতেও সোহাগ তাঁকে সরাসরি হুমকি দিয়েছিল যে, জাসদের রাজনীতি করে প্রকাশ্য রাস্তায় চলাফেরা করা যাবে না। হামলার সময় অস্ত্রধারীরা তাঁর ওপর কয়েক রাউন্ড গুলিও বর্ষণ করে বলে ভুক্তভোগী দাবি করেন। এ ঘটনায় তিনি জড়িতদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তবে আনীত সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত ভেড়ামারা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব এস এস আল হোসাইন সোহাগ। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, আনোয়ারুল কবিরের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তাঁদের মধ্যবর্তী সম্পর্ক সব সময়ই ভালো ছিল। তিনি আরও বলেন, “আমি একটি দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন অপকর্মে জড়াতে পারি না। আগামী পৌর নির্বাচনে আমি সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে সামাজিক কাজ করছি। এতে আমার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হচ্ছে।”
ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিরা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ভেড়ামারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ জাহেদুর রহমান জানিয়েছেন, খবর পেয়েই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, তবে সেখানে গুলিবর্ষণের কোনো আলামত বা চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, পেছন দিক থেকে সাবেক মেয়রের ওপর ধারালো অস্ত্রের আঘাত হানা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী কিংবা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তবে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ঘটনার পেছনের মূল আসামিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
