নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদকে নেওয়ার জন্য মাঝনদী থেকে একটি ফেরি ফিরিয়ে আনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে নোয়াখালীর চেয়ারম্যান ঘাট থেকে নলচিরা ঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ফেরি ‘মহানন্দা’ প্রায় ২০ মিনিট পথ অতিক্রম করার পর সংসদ সদস্যের নির্দেশে আবার ঘাটে ফিরে আসে। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ফেরির সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে, যা জনমনে জনপ্রতিনিধিদের আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘাট সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, সেদিন নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বেলা সাড়ে তিনটায় যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন নিয়ে ফেরি মহানন্দা চেয়ারম্যান ঘাট থেকে নলচিরা ঘাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ফেরিটি ঘাট থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে যাওয়ার পর নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ তার গাড়িবহর নিয়ে চেয়ারম্যান ঘাটে পৌঁছান। হাতিয়া যাওয়ার জন্য জরুরি প্রয়োজন দেখিয়ে তিনি ফেরি কর্তৃপক্ষকে সেটিকে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। সাধারণত চেয়ারম্যান ঘাট থেকে নলচিরা ঘাটে পৌঁছাতে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। মাঝনদী থেকে ফেরি ঘুরিয়ে ঘাটে ফিরিয়ে আনা হলে যাত্রীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং তাদের মধ্যে চরম বিরক্তি দেখা দেয়।
ফেরির মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সাজ্জাদুল ইসলাম এই ঘটনা প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘাট থেকে আনুমানিক ১০ মিনিট চলার পর সংসদ সদস্যের আসার খবর পেয়ে ফেরিটি ঘাটে ফিরিয়ে আনা হয়। সংসদ সদস্য নাকি সরাসরি তাদের ম্যানেজারকে ফোন করে তাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলেছিলেন। একইভাবে ঘাট ইজারাদারের প্রতিনিধি মো. জহির উদ্দিনও প্রথম আলোকে জানান যে, ফেরি ছাড়ার সময় নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকলেও সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদকে নেওয়ার জন্য বেলা সাড়ে তিনটায় ছেড়ে যাওয়া ফেরিটি প্রায় ২০ মিনিট পর আবার ঘাটে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন, হাতিয়ায় ফেরি সার্ভিস চালু হওয়ার পর এমন ঘটনা এটিই প্রথম।
একাধিক যাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, এমনিতেই বৈরী আবহাওয়ার কারণে মেঘনা নদী পারাপারে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছিল। তার ওপর ঘাট থেকে অনেকটা পথ চলে আসার পর হঠাৎ ফেরি উল্টো ঘুরতে দেখে তারা বিস্মিত হন। ঘাটে ফিরে আসার কারণ জানতে পেরে তারা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন, যখন জানতে পারেন যে একজন সংসদ সদস্যকে ওঠানোর জন্য ফেরিটি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যাত্রীরা এই ঘটনাকে ক্ষমতার দাপট প্রদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, একজন জনপ্রতিনিধির জন্য সাধারণ জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলা কোনোভাবেই উচিত হয়নি। এতে তাদের সময় ও অর্থের অপচয় হয়েছে।
এই ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ প্রথম আলোকে তার নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সংসদ সদস্য। সরকারি কাজেই আমার হাতিয়া যাওয়া জরুরি ছিল। তাই আমাকে ফেরিতে যেতে হয়েছে।’ তিনি আরও দাবি করেন যে, ফেরি ঘাট থেকে খুব বেশি দূর যায়নি, ছাড়ার এক মিনিটের মধ্যেই তিনি ঘাটে পৌঁছেছেন। তার মতে, একটি ‘কুচক্রী মহল’ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
তবে সংসদ সদস্যের এই দাবি ফেরি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যেখানে ফেরিটি ২০ মিনিট চলার পর ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধির সরকারি কাজ যত জরুরিই হোক না কেন, সাধারণ জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি করে এমন বিশেষ সুবিধা গ্রহণ জনসেবার মূল চেতনার পরিপন্থী। বৈরী আবহাওয়ায় যখন যাত্রীরা এমনিতেই আতঙ্কের মধ্যে থাকেন, তখন এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত তাদের নিরাপত্তা ও মানসিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ঘটনা জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বশীলতা এবং ক্ষমতার সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, একজন সংসদ সদস্যের জন্য যদি এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের জন্য সেবার মান কতটা নিশ্চিত থাকবে। এমন নজিরবিহীন ঘটনা ভবিষ্যতে যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি এবং সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
