চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের নির্মম শিকার হয়ে দুই শিশুর অকাল মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাহারছড়া ইউনিয়নে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুরা হলো বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের প্রবাসী কামাল উদ্দিনের সাত বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আশিক এবং একই ইউনিয়নের রত্নপুর এলাকার তিন বছর বয়সী মোহাম্মদ মিরাজ। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে চট্টগ্রাম অঞ্চল, বিশেষ করে বাঁশখালীতে লাগাতার ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর ফলস্বরূপ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় সৃষ্ট ঢল নিম্নাঞ্চলে নেমে এসে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে। শুক্রবার সকালে এই দুই শিশু তাদের বাড়ির উঠোনে খেলা করছিল। হঠাৎ করেই পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির তীব্র স্রোত তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়, যা এলাকায় এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা করে।
পাহাড়ি ঢলে দুই শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. এনাম। তিনি জানান, এমন একটি অপ্রত্যাশিত ও হৃদয়বিদারক ঘটনা গোটা ইউনিয়নকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। শিশুদের পরিবারে নেমে এসেছে চরম শোকের মাতম, যা স্থানীয়দের মনেও গভীর রেখাপাত করেছে। এই ঘটনা আবারও বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলের ভয়াবহতা এবং শিশুদের সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিল।
বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রবিউল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, তারা দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর নিহত শিশুদের দাফনের ব্যবস্থা করা হবে। সাধারণত, পাহাড়ি ঢলে ভেসে যাওয়ার ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবেই গণ্য করা হয় এবং এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢল এবং ভূমিধসের ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। এতে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ তারা অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত থাকে না এবং নিজেদের রক্ষা করতে পারে না।
এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মীরা। তাদের মতে, বর্ষার পূর্বে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সচেতন করা, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং শিশুদের অভিভাবকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করা অপরিহার্য। এছাড়া, পাহাড়ি ঢল প্রবণ এলাকায় শিশুদের বাড়ির বাইরে একা না ছাড়ার বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরেছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
