Friday , July 10 2026
Breaking News
পেনাল্টিতে থমকে যাওয়ার আধুনিক কৌশল কি ব্যর্থ হচ্ছে? এমবাপ্পের মিস ও ফুটবলের নতুন বিতর্ক

পেনাল্টিতে থমকে যাওয়ার আধুনিক কৌশল কি ব্যর্থ হচ্ছে? এমবাপ্পের মিস ও ফুটবলের নতুন বিতর্ক

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মরক্কোকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার আনন্দে ভাসছে ফ্রান্স। তবে এই জয়ের মাঝেও ফরাসি ফুটবল সমর্থকদের মনে কিছুটা হলেও খচখচানি তৈরি করেছে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি মিস। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কোনো খেলোয়াড়ের পেনাল্টি মিস করার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ২০১৪ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে করিম বেনজেমার পর এবারই প্রথম ফরাসি কোনো তারকা পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলেন। এমবাপ্পের এই মিস কেবল একটি ব্যর্থ শটই নয়, বরং ফুটবল বিশ্বে পেনাল্টি নেওয়ার আধুনিক ‘থমকে যাওয়া’ কৌশল নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টি নেওয়ার সময় এমবাপ্পে দৌড়ের গতি কমিয়ে গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুর গতিবিধি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। নেইমার ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো তারকারা অতীতে বহুবার এই কৌশল ব্যবহার করে সফল হয়েছেন। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কিক নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্ত ছাড়া দৌড়ের যেকোনো পর্যায়ে খেলোয়াড়েরা গতি কমাতে বা ছক পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু মরক্কোর গোলরক্ষক বুনু আগেভাগে কোনো একদিকে ঝাঁপ না দিয়ে নিজের জায়গায় অনড় থাকেন এবং সহজেই এমবাপ্পের দুর্বল শটটি রুখে দেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, গোলরক্ষকেরা যদি শান্ত থাকেন, তবে এই আধুনিক কৌশলটি পেনাল্টি দাতার জন্য চরম বুমেরাং হতে পারে।

পরিসংখ্যানও এই থমকে যাওয়ার কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ মোট ২৬টি পেনাল্টি নেওয়া হয়েছে এই গতি কমিয়ে থমকে যাওয়ার কৌশলে। যার মধ্যে মাত্র ১১টি থেকে গোল এসেছে, অর্থাৎ সফলতার হার মাত্র ৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে, স্বাভাবিক গতিতে দৌড়ে নেওয়া ৩৫টি পেনাল্টীর মধ্যে গোল হয়েছে ২৪টিতে, যার সফলতার হার ৬৮ শতাংশ। আর্সেনাল কিংবদন্তি ইয়ান রাইট এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মনে হচ্ছে গোলরক্ষকেরা এখন পেনাল্টি দাতার এই থমকে যাওয়ার কৌশলটি ধরে ফেলেছেন। তাঁরা এখন আর সহজে ফাঁদে পা দিচ্ছেন না।’

এই বিশ্বকাপে কেবল এমবাপ্পেই নন, লিওনেল মেসি, হ্যারি কেইন এবং ব্রুনো গিমারাইসের মতো বিশ্বমানের তারকারাও এই কৌশলের আশ্রয় নিয়ে পেনাল্টি মিস করেছেন। তবে হ্যারি কেইন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়বার পেনাল্টি পাওয়ার পর আর গতি না কমিয়ে সরাসরি শট নিয়ে গোল করতে সক্ষম হন। সামগ্রিকভাবে এবারের বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিসের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। টাইব্রেকার বাদে পেনাল্টি মিসের হার ৩০ শতাংশ, যা ১৯৬৬ সালের পর যেকোনো বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আর টাইব্রেকারসহ হিসাব করলে এই মিসের হার দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে, যা ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড।

এমবাপ্পের পেনাল্টি মিসের পেছনে কেবল কৌশলের ভুল নয়, মনস্তাত্ত্বিক চাপও একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজার পর ভিএআর (VAR) রিভিউয়ের কারণে এমবাপ্পেকে দীর্ঘ ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আয়ারল্যান্ডের সাবেক মিডফিল্ডার রয় কিন বলেন, ‘পেনাল্টি নেওয়ার আগে স্ট্রাইকারদের এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানো এক ধরনের অন্যায়। এই অতিরিক্ত সময় গোলরক্ষকদের সুবিধা দেয় এবং পেনাল্টি দাতার মনে সংশয় তৈরি করে।’ ম্যাচ শেষে এমবাপ্পেও স্বীকার করেছেন যে, রেফারি ও ভিএআর-এর সিদ্ধান্তের টানাপোড়েনে তিনি মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিলেন।

সব মিলিয়ে, পেনাল্টি নেওয়ার এই আধুনিক কৌশলটি কি এখন অকার্যকর হয়ে পড়ছে? পরিসংখ্যান এবং গোলরক্ষকদের বর্তমান পারফরম্যান্স অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। মরক্কোর ইয়াসিন বুনুর মতো গোলরক্ষকেরা, যাঁরা বিশ্বকাপে ৯টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়ে মাত্র ২টি গোল হজম করেছেন, তাঁরা প্রমাণ করছেন যে শান্ত ও অবিচল থেকে এই আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক খেলায় জয়ী হওয়া সম্ভব। ফুটবলারদের হয়তো এখন আবারও সেই ঐতিহ্যবাহী ও গতিশীল পেনাল্টি শটের কৌশলে ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে।

এছাড়াও

এমবাপ্পে-দেম্বেলের অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স: বিশ্ব ফুটবলে ফরাসিদের থামাবে কে?

এমবাপ্পে-দেম্বেলের অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স: বিশ্ব ফুটবলে ফরাসিদের থামাবে কে?

ফুটবল বিশ্বে বর্তমানে ফ্রান্স দলের পারফরম্যান্স এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, তাদের পরাজয়ের কথা কল্পনা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *