বিশ্বব্যাপী শারীরিক অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে স্ট্রোক এক গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা। মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিলতার কারণে হঠাৎ করে মস্তিষ্কের একটি অংশ কার্যকারিতা হারালে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলেও, বেঁচে যাওয়া রোগীদের একটি বিশাল অংশ নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক এবং স্নায়বিক জটিলতায় ভোগেন। এসব জটিলতা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। এই রোগীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার একমাত্র কার্যকর উপায় হলো সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। আর এর জন্য একজন ফিজিক্যাল মেডিসিন ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান অপরিহার্য।
স্ট্রোকের পর কেবল শরীরের একপাশে পক্ষাঘাত নয়, বরং আরও বহুবিধ জটিলতা ও ঝুঁকির সম্মুখীন হন রোগীরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া, যা ‘স্পাসটিসিটি’ নামে পরিচিত। এর ফলে হাত-পা বাঁকা হয়ে যেতে পারে এবং নড়াচড়া করা কঠিন হয়ে পড়ে। কাঁধে তীব্র প্রদাহ ও ব্যথাও একটি সাধারণ সমস্যা, যা রোগীর চলাফেরাকে আরও ব্যাহত করে। দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে শুয়ে থাকার কারণে ত্বকের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়ে ঘা বা সংক্রমণ (বেড সোর) হতে পারে। এছাড়া, অচল পায়ের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার (ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস বা ডিভিটি) ঝুঁকি থাকে। এই জমাট রক্ত যদি রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে ফুসফুসে চলে যায়, তাহলে পালমোনারি এম্বোলিজম নামক প্রাণঘাতী রোগের সৃষ্টি হতে পারে, যা স্ট্রোক রোগীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
খাবার গ্রহণ এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের জটিলতাও স্ট্রোক-পরবর্তী একটি মারাত্মক সমস্যা। গিলতে অসুবিধা হওয়ার কারণে খাদ্য বা লালা ভুল করে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে ‘এসপিরেশন নিউমোনিয়া’ ঘটাতে পারে। কফ পরিষ্কার করার অক্ষমতাও নিউমোনিয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী কাশির কারণ হতে পারে। এসব শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতা স্ট্রোক রোগীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এছাড়াও, ভারসাম্যহীনতার কারণে পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার ঝুঁকি থাকে। মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ, মূত্রনালির সংক্রমণ এবং খিঁচুনির মতো সমস্যাগুলোও স্ট্রোক-পরবর্তী সময়ে প্রায়শই দেখা যায়, যা রোগীর সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।
স্ট্রোক আক্রান্ত রোগীকে সুস্থ করে তোলার প্রক্রিয়ায় ফিজিওথেরাপিস্টদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম, হাঁটার প্রশিক্ষণ (গেট ট্রেনিং), স্ট্রেচিং, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালন (মোবিলাইজেশন) এবং বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা ব্যবহারের মাধ্যমে পেশির শক্তি ও নড়াচড়া ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। তবে, ফিজিওথেরাপিস্টরা রোগ নির্ণয়, ঔষধপত্র, ইনজেকশন বা কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি সরাসরি প্রেসক্রাইব করেন না। তাদের কাজ মূলত পুনর্বাসন পরিকল্পনার শারীরিক দিকটি বাস্তবায়ন করা।
এখানেই একজন ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি রোগীর স্নায়বিক অবস্থা, পেশির টান, জয়েন্টের গতিশীলতা, খাবার গেলার সক্ষমতা এবং মানসিক অবস্থা — এই সবকিছু সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজনে তিনি ইলেকট্রোমায়োগ্রাফি (ইএমজি), সোয়ালো স্টাডি (গেলার পরীক্ষা) এবং ডপলার আলট্রাসাউন্ডের মতো বিশেষায়িত পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ দেন। এই বিস্তারিত মূল্যায়নের ভিত্তিতেই তিনি প্রতিটি রোগীর জন্য একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরি করেন। এই বিশেষজ্ঞরাই ঔষধপত্র ও অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করেন এবং পুরো পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করেন।
একটি আদর্শ স্ট্রোক পুনর্বাসন দল (রিহ্যাব টিম) বহু-বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত হয়। এই দলে সাধারণত একজন ফিজিওথেরাপিস্ট, একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, একজন স্পিচ থেরাপিস্ট, একজন সাইকোলজিস্ট, একজন নিউরোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, একজন পুষ্টিবিদ এবং অবশ্যই একজন ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত থাকেন। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট রোগীকে দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মে (যেমন – পোশাক পরা, খাওয়া) স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেন। স্পিচ থেরাপিস্ট কথা বলা ও গিলতে পারার সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। সাইকোলজিস্ট রোগীর মানসিক স্বাস্থ্য এবং পরিবারের সদস্যদের সহায়তা প্রদান করেন। নিউরোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ স্ট্রোকের কারণ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা করেন। পুষ্টিবিদ রোগীর জন্য উপযুক্ত খাদ্যতালিকা তৈরি করেন, বিশেষ করে যখন গিলতে অসুবিধা হয়। এই সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই স্ট্রোক আক্রান্ত একজন রোগী তার সর্বোচ্চ সক্ষমতা ফিরে পেয়ে আবারও সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসতে পারেন।
ডা. এইচ এন মাসুক রহমান, যিনি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্স (বিআইএইচএস)-এর ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতাগুলো সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে এবং রোগীদের একটি কার্যকর পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে একটি সুসংগঠিত এবং বিশেষজ্ঞ-নির্ভর দল অপরিহার্য। এই সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমেই স্ট্রোক আক্রান্ত ব্যক্তিরা কেবল বেঁচে থাকেন না, বরং মানসম্মত জীবনও ফিরে পান।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
