দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ককে বিশ্বরাজনীতিতে ‘অটুট’ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পর্কের ভিত্তি নিয়ে খোদ ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহল ও গণমাধ্যমে ব্যাপক উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ডেমোক্র্যাটিক দলের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাবের তীব্র উত্থান এই সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থীদের বিজয় ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েল যে নিঃশর্ত মার্কিন সমর্থন পেয়ে এসেছে, তা এখন প্রশ্নের মুখে। একসময় ওয়াশিংটনের কাছে ইসরায়েলকে একটি ‘কৌশলগত সম্পদ’ হিসেবে দেখা হলেও, এখন অনেক মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলকে একটি ‘বোঝা’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। বিশেষ করে গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘন, ব্যাপক প্রাণহানি এবং মানবিক সংকটের চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। নিউইয়র্ক টাইমস ও পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক জরিপগুলো তারই প্রতিফলন। জরিপ অনুযায়ী, মার্কিন জনমতের একটি বড় অংশ এখন ইসরায়েলের পরিবর্তে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল, যা অতীতে অকল্পনীয় ছিল।
ইসরায়েলের সাবেক কনসাল জেনারেল আসাফ জামিরসহ দেশটির অনেক রাজনীতিক এই নতুন বাস্তবতায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এটি কেবল সামরিক সহায়তা হারানোর ভয় নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি শক্তিশালী মিত্রের অটুট নৈতিক সমর্থনের জায়গাটি হারিয়ে ফেলার ভয়। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—নেতানিয়াহু সরকারের নীতি কি সত্যিই দুই দেশের জাতীয় স্বার্থকে এক বিন্দুতে রাখতে পারছে? নাকি এই টানাপোড়েন ভবিষ্যতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে?
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল সি কার্টজারের মতে, সম্পর্কটি এখন একটি গভীর খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় শিবিরের মধ্যেই ইসরায়েলের বর্তমান যুদ্ধনীতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অসন্তোষ দানা বাঁধছে। যেখানে ডেমোক্র্যাটরা মানবাধিকার ও মানবিক বিপর্যয়ের কথা বলছেন, সেখানে রিপাবলিকানদের একাংশ মনে করছেন, ইসরায়েল তার আঞ্চলিক সংঘাতগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জড়িয়ে ফেলছে। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার তথাকথিত বিশেষ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যা ইসরায়েলের ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
