Thursday , July 2 2026
Breaking News

রুশ হজযাত্রীদের অজানা অধ্যায়: সাম্রাজ্য ও তীর্থযাত্রার এক ঐতিহাসিক দলিল

ইসলামের ইতিহাস কিংবা হজের ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে রাশিয়া ও সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভূমিকা প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। তবে ইতিহাসবিদ ইলিয়েন এম কেন তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘রাশিয়ান হজ: এম্পায়ার অ্যান্ড দ্য পিলগ্রিমেজ টু মক্কা’-তে এই অস্পষ্টতাকে দূর করার চেষ্টা করেছেন। ২০১৫ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এই বইটিতে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর রুশ সাম্রাজ্য থেকে মক্কা অভিমুখে তীর্থযাত্রার এক চমকপ্রদ ও বিস্তারিত চিত্র ফুটে উঠেছে। বইটি কেবল হাজিদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণাই নয়, বরং রুশ কূটনীতিক ও হেজাজীয় শাসকদের মধ্যকার চিঠিপত্র এবং সমসাময়িক সংবাদপত্রের নিবন্ধের ভিত্তিতে এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে মধ্য এশিয়া ও ককেশাস অঞ্চল রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ইসলাম রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রাশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থোডক্স খ্রিস্টান সংস্কৃতির পাশাপাশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই ধর্মীয় যাত্রা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইলিয়েন এম কেন দেখিয়েছেন যে, জার শাসনামল থেকে শুরু করে পরবর্তী সোভিয়েত আমল পর্যন্ত রুশ সরকার তার মুসলিম প্রজাদের হজ সফরকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করত। একদিকে যেমন শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ছিল, অন্যদিকে রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবেও এটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। রুশ মালিকানাধীন জাহাজ ও রেল কোম্পানির মাধ্যমে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করে সরকার যেমন অর্থনৈতিক মুনাফা অর্জন করেছে, তেমনি হাজিদের যাতায়াত সহজতর করতে বিভিন্ন সরাইখানা নির্মাণ ও হেজাজ রেলপথ স্থাপনে অনুদান প্রদানের মতো অবকাঠামোগত উন্নয়নও করেছে।

বইটির লেখক গুরুত্বারোপ করেছেন যে, উনবিংশ শতাব্দীতে হজ ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তীর্থযাত্রা এবং রাশিয়ার মুসলিমদের জন্য এটি ছিল একক বৃহত্তম পরিযায়ী যাত্রা। অথচ রাশিয়ার মূলধারার অভিবাসন বা পরিযায়ী ইতিহাসে হজের এই বিশালতাকে প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, যা রাশিয়ার ইতিহাসে মুসলমানদের অবদান ও বয়ানকে অবমূল্যায়নেরই বহিঃপ্রকাশ। ইলিয়েন এম কেন তাঁর গবেষণায় এটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, রুশ সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ সীমানা পেরিয়ে মুসলমানরা ধর্মীয়, বাণিজ্যিক ও শিক্ষাগত প্রয়োজনে নিয়মিত যাতায়াত করতেন, যা তাদের এক অত্যন্ত সচল ও সক্রিয় জনগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই গ্রন্থে মানচিত্র ও আলোকচিত্রের সমন্বয়ে রাশিয়ার মুসলিমদের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের যোগাযোগ ও সম্পর্কের বিবর্তনকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আধুনিক ইউরেশীয় প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং তাদের আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগের বিষয়টি বুঝতে এই বইটি একটি মাইলফলক। পরিশেষে বলা যায়, রুশ হজযাত্রীদের এই সফরনামা কেবল ধর্মীয় যাত্রার বিবরণ নয়, বরং এটি সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের লড়াইয়ের এক অনন্য দলিল।

এছাড়াও

ইউরোপে রাজনৈতিক আশ্রয়ের মরীচিকা: তরুণ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ বাস্তবতা

ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে পা রাখলেই রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়—এমন একটি ভ্রান্ত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *