সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির উপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ২৪ ঘণ্টার পুরনো হুমকি প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এসেছিল যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালীর উপর তেহরানের প্রভাব কমানোর জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। যদিও শুল্ক আরোপের এই নির্দিষ্ট প্রস্তাবটি দ্রুত বাতিল করা হয়, তবে এর মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির একটি ক্ষুদ্র অংশই প্রতিফলিত হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করে। বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু প্রণালী দিয়েই সম্পন্ন হয়, যা এটিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য করে তোলে। এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে, দীর্ঘকাল ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইরান প্রায়শই হুমকি দিয়েছে যে, যদি তার তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে তারা এই প্রণালী বন্ধ করে দেবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক চরম অবনতির দিকে গিয়েছিল। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন বা জেসিপিওএ) থেকে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে সরে আসার পর উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। চুক্তি থেকে সরে আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের উপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং তেহরানকে তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে বাধ্য করা। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের তেল বিক্রি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা কার্যত ইরানের বন্দরগুলির উপর এক প্রকার অর্থনৈতিক অবরোধের সমতুল্য ছিল।
২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকিটি সম্ভবত ইরানের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির একটি কৌশলগত প্রয়াস ছিল। তবে, এমন একটি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কতটা কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য হতো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক শিপিং রুটগুলিতে একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ করা সাধারণত আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সম্ভবত আইনি জটিলতা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া বা এর বাস্তবায়নের সম্ভাব্য অসুবিধার কারণেই এই প্রস্তাবটি দ্রুত বাতিল করা হয়েছিল। এর পরিবর্তে, যুক্তরাষ্ট্র তার বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক চাপকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চলেছে।
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব খর্ব করার মার্কিন প্রচেষ্টা কেবল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, যৌথ সামরিক মহড়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলির সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার মাধ্যমেও যুক্তরাষ্ট্র তার উদ্দেশ্য পূরণের চেষ্টা করেছে। এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক শিপিং রুটগুলি উন্মুক্ত রাখা যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের উপর চাপ বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল তেহরানকে তার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে বিরত রাখতে।
সংক্ষেপে, হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের হুমকি প্রত্যাহার করা হলেও, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন চাপ অব্যাহত ছিল। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির একটি অংশ মাত্র, যার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়ে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে হরমুজ প্রণালীর অপরিসীম গুরুত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের জটিলতাকেই তুলে ধরে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
