মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন বিমান হামলার পর পরই বাহরাইনে ইরানি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং একই সময়ে হরমুজ প্রণালীতে একটি জাহাজে আঘাত হানা হয়েছে। এই ঘটনাগুলো ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গণমাধ্যম সূত্র অনুযায়ী, বাহরাইনের আকাশসীমায় একাধিক ইরানি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে, যা দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সতর্ক করে তোলে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, বাহরাইন সরকার এই হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আঘাত হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। উল্লেখ্য, বাহরাইন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর। এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো স্থাপনা ছিল কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে তারা ‘মার্কিন-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে’ আঘাত হেনেছে।
একই সময়ে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। যদিও হামলার বিস্তারিত বিবরণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি, তবে এটি একটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, ফলে এখানে যেকোনো ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
এই ঘটনাগুলো ঘটেছে সম্প্রতি ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলাগুলো চালিয়েছিল তাদের সেনাদের ওপর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার প্রতিশোধ হিসেবে। বিশেষত, জর্ডানের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর ওয়াশিংটন কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। এর ফলস্বরূপ, ইরাক ও সিরিয়ায় ইরান-সংশ্লিষ্ট রেভল্যুশনারি গার্ড এবং তাদের সমর্থিত মিলিশিয়াদের লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়।
ইরান এই মার্কিন হামলাকে আগ্রাসন হিসেবে আখ্যায়িত করে এর কড়া জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। বাহরাইন ও হরমুজ প্রণালীর ঘটনাগুলো সেই হুমকিরই বাস্তব প্রতিফলন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের জেরে এমনিতেই চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন-ব্রিটিশ জোটের পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে।
বাহরাইন সরকার ইরানের এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ ধরনের আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইরান বারবার দাবি করে আসছে যে, তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর, তবে তাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থে আঘাত এলে তারা তার জবাব দিতে প্রস্তুত।
এই নতুন হামলাগুলো আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঘটাতে পারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার ঘটনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ এটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং তেলের দামের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক মহল এখন পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগের উপর জোর দিচ্ছে। তবে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে ছায়াযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
