ভেনিজুয়েলায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ৯২০ ছাড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিতদের সন্ধানে দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান। ১৬০০ জনেরও বেশি বিদেশি উদ্ধারকারী দল স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে, কারণ জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিকে এক গভীর মানবিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গত সপ্তাহের মাঝামাঝি ভেনিজুয়েলার মধ্যাঞ্চলে আঘাত হানে রিখটার স্কেলে ৭.২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প। এর পরপরই একাধিক আফটারশক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রাজধানী কারাকাসসহ ভ্যালেন্সিয়া, মারাকাইবো ও অন্যান্য প্রধান শহরগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য ভবন ধসে পড়েছে, রাস্তাঘাট ফেটে গেছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, মৃতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং আহতদের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যারা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা উদ্ধারকারী দলগুলো ভেনিজুয়েলার জরুরি পরিষেবা কর্মীদের সাথে একযোগে কাজ করছে। ১৬০০ বিদেশি উদ্ধারকারীর পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরাও দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কুকুর, বিশেষ সরঞ্জাম এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো এবং বিস্তীর্ণ ধ্বংসযজ্ঞ উদ্ধার কাজকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা জীবিতদের উদ্ধারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। ফলে উদ্ধারকারীদের মধ্যে এক প্রকার সময়ের সাথে পাল্লা দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, কারণ প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুর্বল অবকাঠামোর বাসস্থানগুলো। বিশেষত, ভেনিজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অংশ হিসেবে নির্মিত অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন প্রকল্পগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এসব বাড়ির হাজার হাজার বাসিন্দা রাতারাতি গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। সরকার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করলেও, বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খাদ্য, পানীয় জল এবং চিকিৎসা সরবরাহের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা মানবিক পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমন এক সময়ে ভেনিজুয়েলাকে আঘাত হানলো যখন দেশটি দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। একসময় তেল-সমৃদ্ধ এই দেশটি অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের দ্বারপ্রান্তে ছিল বলে অনেকে মনে করছিলেন। কিন্তু এই ভূমিকম্প সেই প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভেনিজুয়েলার পাশে দাঁড়িয়েছে, তবে এই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যাপক সহায়তার প্রয়োজন হবে। ভেনিজুয়েলার কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতিকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি মানবিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে। দেশের দুর্বল অর্থনীতি এবং সীমিত সম্পদ উদ্ধার ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
