একসময় ঢাকাই চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দায় যিনি মার্শাল আর্টনির্ভর অ্যাকশন দৃশ্যে নিজের অপ্রতিদ্বন্দ্বী উপস্থিতি জানান দিতেন, সেই পরিচিত মুখ ইলিয়াস কোবরা এখন তাঁর জন্মভূমি কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়ার গ্রামে এক ভিন্ন জীবন কাটাচ্ছেন। বহু বছর ধরে তিনি সিনেমার ঝলমলে দুনিয়া ছেড়ে নিভৃত পল্লীর জীবন বেছে নিয়েছেন, যেখানে তাঁর দিন কাটে ইবাদত, কৃষিকাজ, পশুপালন ও স্থানীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডে। গ্রামের এই প্রাক্তন তারকাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অনন্য পরিচিতি, যা তাঁর নামে গড়ে ওঠা একটি বাজারকেও স্মরণীয় করে রেখেছে।
ইলিয়াস কোবরার গ্রামের এই নতুন অধ্যায় শুরু হয় কয়েক বছর আগে। চলচ্চিত্র জীবনের ব্যস্ততা পেরিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন নিজ পৈতৃক ভিটায়, যেখানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং গ্রামীণ সরলতায় তিনি খুঁজে পেয়েছেন অনাবিল শান্তি। স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন আর শুধু একজন চলচ্চিত্র তারকা নন, বরং একজন সম্মানিত প্রতিবেশী এবং সমাজের নিবেদিতপ্রাণ সেবক। গ্রামবাসীদের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ প্রায় এক যুগ আগে তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’। সম্প্রতি এই বাজারেই বসে তিনি তাঁর চার দশকের চলচ্চিত্র জীবন, গ্রামে ফিরে আসার প্রেক্ষাপট, বাজার প্রতিষ্ঠা এবং বর্তমান জীবনযাপন নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেন।
নিজের পরিবর্তিত জীবন সম্পর্কে ইলিয়াস কোবরা বলেন, “চল্লিশ বছর ধরে চলচ্চিত্রে কাজ করেছি এবং পাঁচ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু এখন সেই জীবনে ফিরে যাওয়ার কোনো আগ্রহ নেই। বাকিটা জীবন আমি এই গ্রামেই কাটিয়ে দিতে চাই। কৃষিকাজ, ইবাদত এবং মানুষের কল্যাণে কিছু করতে পারলেই সেটাই আমার জন্য পরম শান্তি।” তাঁর এই উক্তি থেকে স্পষ্ট যে, রুপালি পর্দার জাঁকজমক তাঁর বর্তমান আত্মিক শান্তির কাছে ম্লান হয়ে গেছে।
বাহারছড়া ইউনিয়নের পাকা সড়কের দু’পাশে গড়ে ওঠা ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’ বর্তমানে ৪৫টিরও বেশি দোকান নিয়ে এক ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তাজা মাছ, শাকসবজি, পান-সুপারি, নারকেল ও মৌসুমী ফল পাওয়া যায়। স্থানীয় দোকানদার নুরুল ইসলাম জানান, এই বাজারটি প্রতিষ্ঠার আগে এলাকার মানুষকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে টেকনাফ সদরে যেতে হতো কেনাকাটার জন্য। বাজারটি হওয়ায় এখন তাদের সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে। তবে, সাম্প্রতিককালে এই অঞ্চলে অপহরণ ও মানব পাচারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বাজারের ক্রেতাদের আনাগোনা কিছুটা কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিজের নামে বাজার প্রতিষ্ঠার গল্প বলতে গিয়ে ইলিয়াস কোবরা জানান, গ্রামের নাম ‘নোয়াখালী’ বা ‘নোয়াখালী পাড়া’ হওয়ায় অনেকে বিভ্রান্ত হতেন। ২০১৫ সালে যখন তিনি গ্রামে আসেন, তখন স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর কাছে এই নতুন বাজারের নাম ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’ রাখার অনুমতি চান। তাদের আগ্রহ দেখে তিনি সানন্দে সম্মতি দেন। এরপর তাঁর উপস্থিতিতে একটি সাইনবোর্ড স্থাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাজারের নামকরণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে একটি মুদি দোকান দিয়ে শুরু হলেও, এখন এটি ৪৫টির বেশি দোকানের এক বড় বাজার। দূরদূরান্ত থেকে শতবর্ষী গর্জনবন, পাহাড় ও ঝরনা দেখতে আসা পর্যটকরাও ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’ দেখে থমকে দাঁড়ান এবং স্থানীয় ফলমূল কিনে নেন। এই বাজার বহু মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
চলচ্চিত্রের রঙিন দুনিয়া ছেড়ে গ্রামে ফিরে এলেও ইলিয়াস কোবরাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে নতুন এক কঠিন বাস্তবতার। বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ঘেঁষা এলাকাটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মানব পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারে আলোচনার সময়েও তিনি কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে এই সমস্যা নিয়েই কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, “প্রতি দু-এক দিন পরপরই পাহাড় থেকে নেমে এসে সন্ত্রাসীরা গ্রামবাসীদের তুলে নিয়ে যায়। কয়েক দিন আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করে। এটি গ্রামের মানুষের জন্য এক বড় আতঙ্কের কারণ।”
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইলিয়াস কোবরা নিজেই উদ্যোগী হয়েছেন। তিনি গ্রামের মানুষদের চারটি দলে ভাগ করে প্রায় ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে পালাক্রমে গ্রাম পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার ফলে অপহরণের ঘটনা কিছুটা কমে এসেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকেও তাঁরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন।
মোহাম্মদ ইলিয়াস, যিনি চলচ্চিত্রে ইলিয়াস কোবরা নামেই পরিচিত, ১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। চলচ্চিত্রে আসার আগে তিনি একজন মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন এবং টেকনাফ, কক্সবাজার ও ঢাকায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করেন। ১৯৮৭ সালে চিত্রনায়ক ও পরিচালক সোহেল রানা পরিচালিত ‘মারুফ শাহ’ ছবির মাধ্যমে তাঁর রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে। এরপর প্রায় চার দশক ধরে তিনি পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। নব্বইয়ের দশকে মার্শাল আর্টনির্ভর অ্যাকশন সিনেমায় রুবেল, রতন তালুকদারসহ অনেক নায়কের বিপরীতে তাঁর খলনায়কের চরিত্রগুলো দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ‘ভাইয়া নাম্বার ওয়ান’ চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেন এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। সর্বশেষ শিল্পী সমিতির নির্বাচনে তিনি সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
বর্তমানে চলচ্চিত্রের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে ইলিয়াস কোবরার দিন কাটছে কৃষিকাজ, গরু-ছাগলের খামার দেখাশোনা, মসজিদ পরিচালনা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে। তিনি স্থানীয় সাগরপাড় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও আছেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মসজিদ পুনর্নির্মাণ, কবরস্থান সম্প্রসারণ এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমিও কেনা হয়েছে, যা স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তিনি বর্তমানে মা, স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে গ্রামে বসবাস করছেন, যদিও তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা ঢাকা ও টেকনাফের মধ্যে আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকেন।
ইলিয়াস কোবরা বলেন, “গ্রামের প্রতি আমার টান সব সময়ই ছিল। সিনেমার ব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ পেলেই গ্রামে চলে আসতাম। এখন আমি স্থায়ীভাবে এখানে আছি। মানুষের কথা শুনি, তাদের সমস্যার সমাধানে চেষ্টা করি। আমার দ্বারা যদি কারও বিন্দুমাত্র উপকার হয়, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।” বিকেলের ম্লান আলোয় নিজের নামে গড়ে ওঠা বাজারে ক্রেতাদের আনাগোনা চলছিল। কথোপকথন শেষে, একসময়ের রুপালি পর্দার সেই ভয়ংকর খলনায়ক ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে হেঁটে যান, যেখানে তাঁর নতুন পরিচয় – একজন সমাজসেবী এবং ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
