উরুগুয়ের জাতীয় ফুটবল দলের কোচ মার্সেলো বিয়েলসার আবেগঘন বিদায় এবং বিশ্বকাপ থেকে দলটির অপ্রত্যাশিত দ্রুত প্রস্থান ফুটবল মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গ্রুপ পর্ব থেকে লা সেলেস্তের বিদায়ের রেশ এখনো দলের অন্দরমহলে বিরাজমান। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ‘টিওয়াইসি স্পোর্টস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্পেনের কাছে পরাজয়ের পর কোচ মার্সেলো বিয়েলসা দলের সকল খেলোয়াড়কে মেক্সিকোর প্লায়া দেল কারমেনের একটি হোটেলে ডেকেছিলেন। সেই বৈঠকে তিনি গভীর হতাশা ব্যক্ত করে জানান যে, দলের এমন কঠিন সময়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ একা অনুভব করছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে খেলোয়াড়দের সাথে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাদের জন্য নির্ধারিত চার্টার্ড বিমান বাতিল করায় খেলোয়াড়দের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে আলাদা আলাদাভাবে দেশে ফিরতে হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে। প্লায়া দেল কারমেনের হোটেলে ২৬ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে আয়োজিত এই বৈঠকটি ছিল মন খারাপ করা এক পরিবেশে। কোচ মূলত তার একতরফা বক্তব্য পেশ করেন, যেখানে তিনি নিজের হতাশা ও বিষাদ প্রকাশ করেন। যদিও স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের পর মাঠে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বিয়েলসা মেজাজ হারিয়ে চিৎকার করেছিলেন, এই বৈঠকে তিনি তুলনামূলক শান্ত ছিলেন। তবে তার ভেতরের যন্ত্রণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এমনকি দলের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মধ্যেও যখন বিষাদ ও হতাশার পরিবেশ বিরাজ করছিল, তখন কোচ সরাসরি বলে ওঠেন, ‘আমি দুঃখ নিয়ে বিদায় নিচ্ছি, কারণ তোমরা আমাকে একা ফেলে দিয়েছিলে।’
বিশ্বকাপে উরুগুয়ের পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। তারা ‘গ্রুপ এইচ’-এ দুটি ড্র এবং একটি পরাজয়ের ফলে স্পেন ও কেপ ভার্দের পেছনে এবং সৌদি আরবের সামনে থেকে তৃতীয় স্থানে থেকে গ্রুপ পর্ব শেষ করে। এর ফলে তারা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠতে ব্যর্থ হয়, যা উরুগুয়ের মতো ফুটবল ঐতিহ্যবাহী দেশের জন্য এক বড় ধাক্কা। এই অপ্রত্যাশিত বিদায় কেবল খেলোয়াড়দের মধ্যেই নয়, উরুগুয়ের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও গভীর হতাশার সৃষ্টি করেছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে, মার্সেলো বিয়েলসা মঙ্গলবার (আজ) সেনতেনারিও স্টেডিয়ামে একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন, যেখানে তিনি জাতীয় দল থেকে তার সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেন। ২০২৩ সালে দিয়েগো আলোনসোর অধীনে কাতার বিশ্বকাপ থেকে উরুগুয়ের বিদায়ের পর বিয়েলসা দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তার কোচিংয়ে একটি নতুন কৌশলগত পরিবর্তন এবং দলের পুনরুজ্জীবনের আশা করা হয়েছিল, কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যেই তার এই অধ্যায় শেষ হতে চলেছে।
‘এল লোকো’ নামে পরিচিত মার্সেলো বিয়েলসা তার তীব্র, চাহিদা সম্পন্ন এবং অপ্রচলিত কোচিং পদ্ধতির জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। আর্জেন্টিনা, চিলি, এবং লিডস ইউনাইটেডের মতো দলগুলোতে তার প্রভাব অনস্বীকার্য। উরুগুয়ের দায়িত্ব নেওয়ার সময় তার কাছে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া, বিশেষ করে দলের তরুণ প্রতিভাদের বিকশিত করা এবং একটি আক্রমণাত্মক ও গতিশীল ফুটবল উপহার দেওয়া। তবে, বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
বিদায়ের পর এক সংবাদ সম্মেলনে, তিন বছরেরও বেশি সময় কাজ করার পর দেশটির ফুটবলে তিনি কী অবদান বা ‘উত্তরাধিকার’ রেখে যাচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে কোচ অকপটে বলেছিলেন যে, তিনি আসলে কিছুই রেখে যাচ্ছেন না। গত শুক্রবার তিনি আরও বলেন, ‘উরুগুয়ের ফুটবলের জন্য আমি কী রেখে যাচ্ছি? কিছুই না। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কিভাবে আমাকে মনে রাখা হবে, তবে আমার উত্তর হবে—এমন একজন হিসেবে, যিনি এসেছিলেন কিন্তু কিছুই রেখে যাননি।’ এই মন্তব্য তার গভীর হতাশা এবং হয়তো নিজের প্রতি কঠোর আত্মসমালোচনার ইঙ্গিত দেয়। উরুগুয়ের ফুটবল এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে, যেখানে নতুন কোচকে দলের পুনর্গঠন এবং হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
