রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাধার গুলশান লেকের পরিবেশগত মানোন্নয়ন এবং একে দূষণমুক্ত রাখতে একটি ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়েছে। ‘চলো খাল বাঁচাই’ স্লোগানকে সামনে রেখে এই বিশেষ কার্যক্রমটি শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পরিচালিত হয় এবং এটি আগামী রোববার পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু লেক পরিষ্কার রাখা নয়, বরং বছরব্যাপী এর রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় নজরদারি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), গুলশানের স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন গুলশান সোসাইটি, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন পিএলসি বাংলাদেশ এবং বেসরকারি সংস্থা ফুটস্টেপস বাংলাদেশ এই মহৎ কর্মযজ্ঞে যৌথভাবে অংশ নিচ্ছে। এই সম্মিলিত প্রয়াস প্রমাণ করে যে, পরিবেশ সংরক্ষণ একক কোনো সত্তার দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি সামাজিক আন্দোলন যা সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ দাবি করে।
অভিযানের প্রথম দিনে গুলশান-২ লেক ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক অত্যন্ত উদ্যমের সাথে কাজ করছেন। তারা লেকের ভাসমান বর্জ্য অপসারণ করছেন এবং লেকের পাড় ও সংলগ্ন সড়ক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করছেন। সংগৃহীত আবর্জনা লেকের পাড়ে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে এবং পাশের ময়লা কালো পলিথিনের ব্যাগে সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফুটস্টেপস বাংলাদেশ-এর স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও এই কাজে হাত লাগিয়েছেন, যা এই কর্মসূচির ব্যাপকতা ও জনসম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়।
কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের চিফ ডিজিটাল অফিসার আহমেদ জাফরুল হাসান জানান, তাদের ব্যাংকের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমাজের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার থেকেই এই অংশগ্রহণ। আয়োজকরা আরও জানান, এই তিন দিনের কার্যক্রমে ৫০০-এর বেশি স্বেচ্ছাসেবী অংশ নিচ্ছেন এবং প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি পরিচালিত হবে। নগরের জলাধার ও খাল রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোই এই কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে ইখলাস উদ্দিন জানান, তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেন এবং সচেতনতা বাড়াতে মোহাম্মদপুর থেকে গুলশানে এসেছেন। আরেক স্বেচ্ছাসেবী প্রত্যাশা সুমন বলেন, ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমেই একসময় ঢাকা একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে। তাদের এই উক্তি তরুণ প্রজন্মের পরিবেশ সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে।
পরিচ্ছন্নতা অভিযান শেষে বিকেলে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে মো. সাইমুম পারভেজ, যিনি পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ, জোর দিয়ে বলেন যে পরিবেশ সংরক্ষণকে কেবল সরকারের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে হবে, যেখানে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে। খাল পুনরুদ্ধার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্বেচ্ছাসেবকদের এমন অংশগ্রহণকে তিনি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান তার বক্তব্যে বলেন, পরিবেশ রক্ষা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত কাজ। ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, মশকনিধন কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। কিছু এলাকায় যন্ত্র বিকল থাকায় সাময়িক সমস্যা হলেও গুরুত্ব অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত তার বক্তব্যে গত দুই দশকে গুলশানে পরিকল্পিত নগরায়ণের বদলে ‘নরকায়ন’ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে, অধিকাংশ এলাকার পয়োনিষ্কাশন লাইন সরাসরি লেকে গিয়ে পড়ছে, যা লেকের দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। গুলশানকে একটি মডেল এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে সকলের সমন্বিত সহযোগিতা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি জোর দেন। কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাজিথ মীওয়ানাগে এবং ফুটস্টেপস বাংলাদেশের সভাপতি শাহ রাফায়াত চৌধুরীও সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন এবং টেকসই পরিবেশ গঠনে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এই উদ্যোগগুলি শুধুমাত্র লেকের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করবে না, বরং ঢাকার অন্যান্য জলাধার সংরক্ষণেও অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
