Saturday , August 1 2026
Breaking News
কুড়িগ্রামের দুর্গম পথে গেন্দু মিয়ার প্রথম বাস: এক রূপকথার যাত্রা

কুড়িগ্রামের দুর্গম পথে গেন্দু মিয়ার প্রথম বাস: এক রূপকথার যাত্রা

আশির দশকে যখন দেশের বেশিরভাগ গ্রামাঞ্চল আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, তখন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী-ভুরুঙ্গামারী অঞ্চলে গেন্দু মিয়ার একটি বাস হয়ে উঠেছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। ১৯৮২ সালের সেই সময়, যখন কাঠ বা গরুর গাড়ির মতো প্রথাগত যানই ছিল একমাত্র ভরসা, তখন এক ইট ও আড়ত ব্যবসায়ী গেন্দু মিয়া ৩৫ কিলোমিটার পথে ডিজেলচালিত একটি মিনিবাস নামিয়েছিলেন, যা মুহূর্তেই ওই এলাকার মানুষের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। রিজভী আহমেদ নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী সেদিনের সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন, যা যুগ যুগ ধরে স্থানীয়দের মুখে মুখে ফেরে।

১৯৮০-এর দশকে কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। ধরলা নদীর পাটেশ্বরী ঘাট পার হয়ে তবেই মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যেত। রংপুর বা ঢাকায় যেতে হলে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে বা রিকশায় পাড়ি দিয়ে প্রথমে ঘাটে পৌঁছাতে হতো, এরপর নৌকায় নদী পার হয়ে কুড়িগ্রাম থেকে বাস বা ট্রেন ধরতে হতো। এ কারণেই তখনকার দিনে রংপুরে যাওয়াকে অনেকেই ‘যমপুর’ বা মৃত্যুর পথে যাত্রা বলে উপহাস করতেন, যেমনটি রিজভী আহমেদ তার লেখায় উল্লেখ করেছেন। যানবাহন বলতে স্রেফ গরুর গাড়ি, রিকশা এবং জংধরা সাইকেলের প্রচলন ছিল। বর্ষাকালে নদীপথ পাড়ি দিতে বাঁশের ভেলা বা ছোট নৌকাই ছিল একমাত্র উপায়, যা গ্রামীণ জীবনকে আরও দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন করে তুলেছিল।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, কুড়িগ্রাম সদরের এক দূরদর্শী ব্যবসায়ী, গেন্দু মিয়া, পাটেশ্বরী-ভুরুঙ্গামারী রুটে একটি মিনিবাস পরিষেবা চালু করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে মাত্র ১০ টাকা ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনের এই উদ্যোগ ছিল সেই সময়ের জন্য অভাবনীয়। ডিজেলে চালিত এবং হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে স্টার্ট দিতে হওয়া এই অদ্ভুতদর্শন যানটি স্থানীয়দের কাছে এক জীবন্ত রূপকথায় পরিণত হয়েছিল। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সবার মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উত্তেজনা দেখা দেয়। গ্রামের ছোট-বড় সবাই ছুটতে থাকে এই ‘আজব গাড়ি’টি এক ঝলক দেখতে।

রিজভী আহমেদ, যিনি তখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিলেন, তার তিন বন্ধু – লুৎফর, কাশেম ও রূপাতনকে নিয়ে স্কুল ছুটির পর ব্যাপারীর হাটে সেই বাস দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেদিন ছিল শুক্রবার। সকালের নাশতা সেরে তারা চার বন্ধু রওনা দেন বিস্তীর্ণ আউশ ধানের মাঠ পেরিয়ে পায়ে হাঁটা সরু পথ ধরে। পথে এক কৃষক তাদের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেন যখন তিনি বাসের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য – ডিজেলচালিত হওয়া এবং হ্যান্ডেল দিয়ে স্টার্ট দেওয়ার কথা – বিস্ময়ের সঙ্গে তুলে ধরেন। প্রায় আধ ঘণ্টা হাঁটার পর তারা যখন ব্যাপারীর হাটে পৌঁছান, তখন সেখানে ছিল কয়েকটি মুদি ও চায়ের দোকান নিয়ে গঠিত একটি ছোট বাজার।

প্রথমে তারা বাসটি দেখতে ব্যর্থ হন, কারণ বাসটি কিছুক্ষন আগেই চলে গিয়েছিল। এই হতাশায় বন্ধুরা ফিরে যেতে চাইলেও রূপাতন নাছোড়বান্দা ছিল, বাস না দেখে ফিরবে না। তার জেদের কাছে হার মেনে সবাই অপেক্ষা করতে থাকে। দেখতে দেখতে কৌতূহলী মানুষের ভিড়ে বাজার ভরে ওঠে। হঠাৎ করে বিকট হর্নের শব্দে সবার মধ্যে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। ধুলা উড়িয়ে একটি রংচটা ছোট্ট মিনিবাস এসে থামে। বেশিরভাগ জানালার কাচ ভাঙা, কাঠের আসন এবং লোহার হাতল দেখে মনে হলেও এটিই ছিল তাদের দেখা প্রথম আধুনিক যান। হেলপার এবং কন্ডাক্টরের কর্মতৎপরতা, বিশেষ করে কন্ডাক্টরের হাতে টাকা গোনার কৌশল, শিশুদের বিস্ময়ে অভিভূত করে তোলে। বাসটি থেকে কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছিল এবং এর ধাতব কাঠামো স্পর্শ করলে মৃদু কম্পন অনুভূত হতো, যা শিশুদের জন্য এক নতুন শিহরণ নিয়ে এসেছিল। অবশেষে কিছু যাত্রী নিয়ে বাসটি আবার বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে ধুলো উড়িয়ে গন্তব্যের দিকে রওনা দেয়, আর মুগ্ধ রিজভী ও তার বন্ধুরা সেই দৃশ্য অপলক তাকিয়ে দেখে।

আজ থেকে বহু বছর পরের এই সময়ে (২০২৬ সাল), কুড়িগ্রামের সেই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্র আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। ২০০৩ সালে ধরলা নদীর ওপর সেতু নির্মিত হওয়ার পর ভূরুঙ্গামারী থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত ডাবল লেনের পাকা সড়ক তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এই পথে প্রতিদিন শত শত অত্যাধুনিক বাস, ঝকঝকে রঙ এবং আকর্ষণীয় অভ্যন্তরীণ সজ্জা নিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করে। রাতের বেলায় এসব বাসের লাল, হলুদ ও সবুজ আলোর ঝলকানি এক ভিন্ন আবহের সৃষ্টি করে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও, রিজভী আহমেদ এবং তার প্রজন্মের মানুষের কাছে গেন্দু মিয়ার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে স্টার্ট দেওয়া সেই প্রথম বাসের স্মৃতি আজও এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এটি শুধু একটি যানের আগমন ছিল না, বরং ছিল এক নতুন যুগের সূচনা, যা গ্রামীণ জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দিয়েছিল।

এছাড়াও

বরিশালে জয়ন্তী নদীতে নৌ পুলিশের ঝটিকা অভিযান: ট্রলারসহ ইয়াবাকারবারি গ্রেপ্তার

বরিশালে জয়ন্তী নদীতে নৌ পুলিশের ঝটিকা অভিযান: ট্রলারসহ ইয়াবাকারবারি গ্রেপ্তার

বরিশাল অঞ্চলের নদীপথে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে নৌ পুলিশ। এর ধারাবাহিকতায় জেলার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *