বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চরম মানবিক সংকট এবং সমুদ্রপথে ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবহেলা এবং মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের কারণে রাষ্ট্রহীন এই জনগোষ্ঠীর জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে নারী ও শিশুদের মৃত্যুর হার বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেছিলেন সাড়ে ছয় হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। এর মধ্যে প্রায় নয়শ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই যাত্রীদের প্রায় ৬৬ শতাংশই নারী ও শিশু। বিশ্বজুড়ে শরণার্থী ও অভিবাসীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সমুদ্রপথের মধ্যে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের এই রুটটিকে সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং প্রাণঘাতী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মূলত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অব্যাহত সংঘাত ও সহিংসতার শিকার হয়ে লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও সেখানে তাদের নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসনের সুযোগ সীমিত রয়েছে।
বাংলাদেশে বসবাসরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবিকার সুযোগের অপর্যাপ্ততা তাদের অপরাধ চক্রের শিকারে পরিণত করছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা তহবিলে বড় ধরনের সংকোচন এবং নানামুখী বিধিনিষেধের কারণে শরণার্থীশিবিরগুলোতে বসবাসরত তরুণ ও শিশুরা মানব পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। চাকরি, উচ্চশিক্ষা কিংবা ভুয়া বিয়ের ফাঁদে ফেলে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র এই অসহায় মানুষদের গভীর সমুদ্রে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া উদ্ধার হওয়া অনেক রোহিঙ্গা শিশু ও তরুণকে পর্যাপ্ত আইনি ও মানসিক সহায়তা ছাড়াই দীর্ঘ সময় আইনি জটিলতার মধ্যে কাটাতে হচ্ছে, যা তাদের মানসিক ট্রমাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘের নারী ও শিশু পাচারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার সিওভান মুল্যালি এবং অভিবাসীদের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার জেহাদ মাদিসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা স্পষ্ট করে বলেছেন, কেবল সাময়িক মানবিক সহায়তা দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং চলাচলের স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা, যা পাচার রোধে এবং এই জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়নে অত্যন্ত জরুরি।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
