মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংকট চরম উত্তেজনাকর মোড় নিয়েছে। ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী বিমান হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক পাল্টাধাওয়া শুরু করেছে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী। এই ধারাবাহিকতায় জর্ডান ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবস্থানগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে চালানো সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি তিনটি সর্বাধুনিক এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আরও তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী বা পেন্টাগন থেকে যুদ্ধবিমান ধ্বংসের এই দাবি অস্বীকার করা হয়েছে, তবে এই সংঘাত সমগ্র অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
দীর্ঘ কয়েক দিনের সাময়িক বিরতির পর সম্প্রতি ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন বাহিনী নতুন করে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি সমর্থিত গোষ্ঠীর হামলার প্রতিশোধ নিতেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরানের ওপর চরম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিপক্ষের যেকোনো হুমকির মুখে কঠোর প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রাখা হবে। নতুন এই হামলায় ইরানের কেশম দ্বীপ, জানজান, বুশেহর এবং খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজসহ একাধিক শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংঘাত কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। জর্ডানের পাশাপাশি কুয়েতের আলী-আল-সালেম সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তেহরান, যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিলেন। ওই ঘাঁটিতে ড্রোন হ্যাঙ্গার ও জ্বালানি ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে আইআরজিসি। পাশাপাশি, সৌদি আরবও মার্কিন বাহিনীর সাথে যৌথভাবে ইরাকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে, যার জবাবে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। একই সময়ে ফিলিস্তিনের গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম হামলায় পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত জটিল রূপ ধারণ করেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া এই সামরিক অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। মার্কিন নৌঘাঁটি ও অবরোধের কারণে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং ওমানের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চললেও তা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো ফল বয়ে আনতে পারেনি। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, রাজনৈতিক সমঝোতার টেবিলে দ্রুত ফিরে না এলে এবং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হলে এই বৈশ্বিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
