ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, কেবল কঠোর শাস্তি প্রদান করে সমাজ থেকে অপরাধ স্থায়ীভাবে নির্মূল করা সম্ভব নয়। অপরাধপ্রবণতার মূল উৎস অনুসন্ধান করে যেসব সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সংকট মানুষকে অপরাধের পথ বেছে নিতে বাধ্য করে, রাষ্ট্র ও সমাজকে সেগুলোর টেকসই সুরাহা করতে হবে। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটর এলাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনের বাতিঘরে ‘কারাগারে অনুসন্ধান’ শীর্ষক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসবে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন।
‘কারাগারে অনুসন্ধান গ্রন্থ সুহৃদ সমাবেশ, ঢাকা’ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জাপানের এহিম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর। শারীরিক অসুস্থতার কারণে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় কারাব্যবস্থা ও ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক সংস্কারের ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বর্তমান কারাব্যবস্থা মূলত ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাষ্ট্রকাঠামোর অন্যতম একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে এখনো টিকে রয়েছে। বইটি উন্মোচন করেছে যে কীভাবে এই কারাগারগুলো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ও অস্বচ্ছ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে দুর্নীতি, শারীরিক নির্যাতন ও অসাধু উপায়ে সুযোগ-সুবিধা কেনাবেচার ঘটনা অহরহ ঘটছে। বিশেষ করে সাধারণ বন্দীদের প্রতি যে অমানবিক আচরণ করা হয়, রাজনৈতিক বন্দীদের আলোচনার ভিড়ে তা প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গবেষণাধর্মী এই বইটি রচনা করেছেন গবেষক মো. খোসবর আলী। তিনি প্রায় টানা ১৪ বছর ধরে দেশ-বিদেশের নানা বিরল দলিল, ঐতিহাসিক নথি, সরকারি রিপোর্ট ও গবেষণা পর্যালোচনা করে প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার এই সুবিশাল আকর গ্রন্থটি চূড়ান্ত করেছেন। বইটি প্রকাশ করেছে ‘পুন্ড্র প্রকাশন’। অনুষ্ঠানে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে লেখক খোসবর আলী জানান, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের ঔপনিবেশিক আমলের কারাব্যবস্থা সংক্রান্ত একটি নিবন্ধ পড়ে তিনি এই গবেষণা কাজে উৎসাহিত হন। আমাদের দেশে এ ধরনের বিষয়ভিত্তিক তথ্য ও নথিপত্রের তীব্র ঘাটতি থাকায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উৎস থেকে দলিলপত্র সংগ্রহ করে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তিনি বইটি সমাপ্ত করেছেন। বইটিতে প্রাক-ঔপনিবেশিক কাল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ উপনিবেশ, আন্দামান দণ্ড-উপনিবেশের ইতিহাস, দণ্ডনীতি, কারাপ্রশাসন, বন্দিশ্রম এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার আদ্যোপান্ত নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি মাঠপর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক হিসেবে অর্জিত নিজের কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে বইটির বিষয়বস্তুর ওপর বাস্তবভিত্তিক আলোকপাত করেন। অন্যদিকে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত দেশ রূপান্তর পত্রিকার সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, রাষ্ট্র যে দায়িত্বটি পালনে ব্যর্থ হয়েছে, লেখক খোসবর আলী একাকী সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন। ভবিষ্যতে যারা কারাগার, বিচারব্যবস্থা কিংবা এই বিষয়ক গবেষণা ও সাংবাদিকতায় যুক্ত হবেন, তাদের জন্য এই গ্রন্থটি একটি অপরিহার্য রেফারেন্স বা আকর গ্রন্থ হিসেবে কাজ করবে। রাষ্ট্র যদি কোনো দিন কারাগার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, তবে এই বইটি নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া লেখক ও উন্নয়নকর্মী নিশাত সুলতানা বইটিতে বর্ণিত নারী বন্দীদের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য, নির্যাতন ও আধিপত্যের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেন। তিনি জানান, ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই কারাগারে নারীরা মারাত্মক বৈষম্য ও অবিচারের শিকার হয়ে আসছেন। প্রকাশনাটির পেছনের গল্প তুলে ধরেন সাংবাদিক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ। সংস্কৃতি চর্চার ছোঁয়ায় তাহসীনা মুস্তারী অবন্তীর সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই আয়োজনটি দেশের বিচারব্যবস্থা ও কারাসংস্কারের দাবিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
