শেষবার্তা প্রতিবেদন : রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও অটোরিকশা জব্দ করা হচ্ছে, কোথাও জরিমানা করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযানের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন নিম্ন আয়ের চালকরা—এমন অভিযোগ তাদের।
কালশি রোডের এক অটোরিকশাচালক বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। ঋণ করে, ধারদেনা করে বা জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে অটোরিকশা কিনেছি। অভিযান চালিয়ে যদি অটো নিয়ে যায়, তাহলে এক মুহূর্তেই আমাদের সব শেষ হয়ে যায়। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার যদি সত্যিই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে রাস্তায় চলমান অটোরিকশা জব্দ করার পরিবর্তে যেসব কারখানায় নতুন অটোরিকশা ও এর যন্ত্রাংশ তৈরি হয়, সেগুলোর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাহলে ধীরে ধীরে নতুন অটোরিকশা বাজারে আসা কমে যাবে এবং পুরোনো অটোগুলোও স্বাভাবিকভাবেই একসময় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে দরিদ্র চালকদের একদিনে পথে বসতে হবে না।”
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা চালকদের অভিযোগ, অভিযানের সময় অনেক ক্ষেত্রে তাদের কথা শোনা হয় না। তারা জানান, একটি অটোরিকশাই তাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। সেটি জব্দ হলে পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেকেই প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। একদিন গাড়ি চালাতে না পারলেই সংসারে অভাব দেখা দেয়। তাদের দাবি, অটোরিকশা জব্দ করার পরিবর্তে নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা, নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ, বৈধ লাইসেন্স প্রদান এবং চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব।
অটোরিকশার সুবিধা
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বর্তমানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের অন্যতম জনপ্রিয় ও সহজলভ্য যানবাহন। সরু গলি, আবাসিক এলাকা এবং যেসব স্থানে বড় বাস বা মিনিবাস চলাচল করে না, সেখানে অটোরিকশাই অনেক মানুষের ভরসা।
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থ রোগীদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে এই যানবাহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি হাজার হাজার চালক এই পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শুধু চালকই নন, গ্যারেজ মালিক, মেকানিক, ব্যাটারি ব্যবসায়ী, চার্জিং স্টেশন, যন্ত্রাংশ বিক্রেতাসহ আরও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান এই খাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।
অটোরিকশার অসুবিধা
অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে অটোরিকশা চলাচলের কারণে বিভিন্ন এলাকায় যানজট বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক চালক ট্রাফিক আইন মেনে চলেন না এবং যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করান, ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
কিছু ক্ষেত্রে অদক্ষ ও প্রশিক্ষণহীন চালকদের অটোরিকশা চালানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার কোথাও কোথাও অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশুদের অটোরিকশা চালাতে দেখা যায়, যা যাত্রী ও পথচারী—উভয়ের জন্যই বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।
এ ছাড়া কিছু এলাকায় অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা বিদ্যুৎ চুরি এবং জননিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। অনেক চালক অতিরিক্ত গতিতে অটোরিকশা চালান এবং সড়ক নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করেন, যার ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
চালকদেরও দাবি, যারা ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে গাড়ি চালান, বিদ্যুৎ চুরি করেন বা বেপরোয়া গতিতে অটোরিকশা চালান—তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে শুধু গাড়ি জব্দ করে দরিদ্র চালকদের ক্ষতিগ্রস্ত না করে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
তাদের মতে, সরকার যদি নতুন অটোরিকশার উৎপাদন, বিক্রি এবং নিবন্ধনের ওপর কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ করে, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অননুমোদিত অটোরিকশার সংখ্যা এমনিতেই কমে আসবে। এতে একদিকে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে, অন্যদিকে হাজারো নিম্নআয়ের পরিবারের জীবিকাও একদিনে বিপর্যস্ত হবে না।
শেষে কালশি রোডের ওই চালক বলেন, “আমরা আইন মানতে চাই। কিন্তু আমাদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনা করা হোক। অটোরিকশা কেড়ে নিলে শুধু একটি গাড়ি যায় না, একটি পরিবারের আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়। সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিক, যাতে সড়কে শৃঙ্খলা থাকে, আবার গরিব মানুষের রুটিও বন্ধ না হয়।”
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
