বর্ষাকাল মানেই প্রকৃতিতে স্নিগ্ধতার ছোঁয়া, তবে শহুরে কিংবা গ্রামীণ জনপদে এই ঋতুটি ঘরের দেয়ালের জন্য নিয়ে আসে নানা বিড়ম্বনা। বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় দেয়াল স্যাঁতসেঁতে হওয়া, নোনা ধরা, ছত্রাক জন্মানো এবং পলেস্তারা বা রং খসে পড়ার মতো সমস্যা প্রায় প্রতিটি গৃহস্থালিতেই নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু সৌন্দর্যবর্ধক বা পছন্দের শেডের রং বেছে নেওয়া এখন আর যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঘরের দেয়ালকে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দিতে এবং নান্দনিকতা বজায় রাখতে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে অ্যান্টিফাঙ্গাল, ওয়াটার রেজিস্ট্যান্স এবং অ্যালকালি রোধক প্রযুক্তির ব্যবহার। বিশেষ করে মেঘলা ও বৃষ্টিমুখর দিনে ঘরের অন্দরমহলে উজ্জ্বল ভাব বজায় রাখতে হালকা শেড বা অফ-হোয়াইটের সঙ্গে সিল্ক কিংবা এগশেল ফিনিশযুক্ত রঙের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমান বাজারে ক্রেতাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশগত বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে রং প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে এসেছে নানা ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি। এর মধ্যে লো-ভিওসি (Volatile Organic Compounds) বা জিরো ভিওসি পেইন্ট উল্লেখযোগ্য। এই ধরনের রঙে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকায় কোনো উৎকট গন্ধ থাকে না এবং ঘরের ভেতরের বায়ুর মান স্বাস্থ্যসম্মত থাকে। পাশাপাশি তাপ-প্রতিফলক বা কুলিং প্রযুক্তির রং সূর্যের ক্ষতিকর তাপ প্রতিফলিত করে ঘরের ভেতরকার তাপমাত্রা প্রাকৃতিকভাবে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম। এছাড়া ওয়াশেবল বা দাগ-প্রতিরোধী প্রযুক্তির কল্যাণে সাধারণ সাবান-পানি ব্যবহার করে খুব সহজেই দেয়ালের ময়লা বা দাগ মুছে ফেলা সম্ভব হয়, যা শিশুতোষ ঘর বা রান্নাঘরের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল রং ব্যবহারের মাধ্যমে দেয়ালে ক্ষতিকর জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার রোধ করাও এখন সহজ হয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গুণগত মান, ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি এবং মোড়কীকরণের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের রঙের দামের ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণ বা ইকোনমি ইন্টেরিয়র পেইন্ট প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। মাঝারি মানের প্লাস্টিক বা অ্যাক্রিলিক ইমালশন রঙের প্রতি লিটারের দাম ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা। অন্যদিকে প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির ইন্টেরিয়র, ওয়াশেবল বা সিল্ক ফিনিশ পেইন্টের জন্য প্রতি লিটারে গুণতে হয় ৫৫০ থেকে ১ হাজার টাকা বা তার বেশি। বহির্ভাগের বা এক্সটেরিয়র রঙের ক্ষেত্রে মাঝারি মানের পণ্যের দাম প্রতি লিটার ৪৫০ থেকে ৭৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম ওয়েদারপ্রুফ, হিট রিফ্লেক্টিভ বা বিশেষ প্রযুক্তিগত এক্সটেরিয়র পেইন্টের দাম প্রতি লিটার ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা বা তার বেশি নির্ধারিত রয়েছে।
সীমিত বাজেটের মধ্যে সঠিক রং নির্বাচন প্রসঙ্গে রেইনবো পেইন্টসের হেড অব বিজনেস এ এস এম ফয়সাল জানান, বাজেট যখন সীমিত, তখন সবার আগে নজর দিতে হবে দেয়ালের মৌলিক সমস্যার সমাধান এবং প্রয়োজনভিত্তিক সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচনের ওপর। কেবল আকর্ষণীয় ফিনিশ বা কম দামের কথা ভেবে রং কিনলে দীর্ঘ মেয়াদে মেরামতের খরচ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। তাই স্যাঁতসেঁতে ভাব, ফাটল বা ড্যাম্পের সমস্যা থাকলে তা পেশাদার উপায়ে সারিয়ে নিয়ে তবেই মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের পণ্য বেছে নেওয়া উচিত। তিনি আরও পরামর্শ দেন যে, শোবার ঘরের জন্য লো-ভিওসি, রান্না ও শিশুদের কক্ষের জন্য পরিষ্কারযোগ্য এবং বাইরের দেয়ালের জন্য আবহাওয়া-প্রতিরোধী রংকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
বাড়ির নান্দনিক রূপায়ণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো এবং পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহারের সচেতনতা এখন অতীতের তুলনায় অনেক বেশি। শিশু সদস্যযুক্ত পরিবার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা আধুনিক যুগের করপোরেট অফিস ও আবাসিক ভবনে স্থপতি এবং গৃহমালিকরা তাই স্বাচ্ছন্দ্যে বেছে নিচ্ছেন পরিবেশবান্ধব ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তির রং। সঠিক পরিচর্যা ও মানসম্মত উপাদানের ব্যবহারে ঘরের দেয়ালের স্থায়িত্ব যেমন বাড়ে, তেমনি অন্দরমহল হয়ে ওঠে আরও স্বাস্থ্যকর ও প্রাণবন্ত।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
