রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) সেমিনার হলে আয়োজিত এক স্মরণসভা ও আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশের (এনইএবি) উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ প্রকৌশলীদের স্মরণে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা অভিযোগ করেন, জনগণের বিপুল রায়ের পরও বর্তমান সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে টালবাহানা ও অনীহা প্রদর্শন করছে। কর্মসংস্থানের খাত নিয়েও কড়া সমালোচনা করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এক কোটি কর্মসংস্থানের বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার সিকিভাগও বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টো বিভিন্ন সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় কোটায় নিয়োগের মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক প্রকৌশলী ড. মাহমুদুর রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই অভ্যুত্থান তিনটি সুনির্দিষ্ট কারণে অনন্য ও ঐতিহাসিক। প্রথমত, এটি ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র একটি বিপ্লব, যেখানে দেশের তরুণেরা কোনো ধরনের অস্ত্র ছাড়াই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। দ্বিতীয়ত, এই বিপ্লবে কোনো বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা নেওয়া হয়নি, যা আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এর প্রধান পার্থক্য গড়ে দেয়। তৃতীয়ত, এই অভ্যুত্থানে কোনো একক বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না; বরং এ দেশের ছাত্র-জনতা স্বয়ং একেকজন নেতা ও যোদ্ধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন হিসেবে না দেখে এটিকে একটি চলমান বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের পুরো কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান সংকট হলো ক্ষমতাকেন্দ্রিক দলগুলোর অতিমাত্রায় ভারতপ্রীতি এবং ধর্মভিত্তিক দলগুলোর অন্ধ ক্ষমতা লিপ্সা। নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সৎ ও যোগ্য মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি সরকারের বিভিন্ন মহলের অনীহার কথা উল্লেখ করে বলেন, পুরোনো আমলাতান্ত্রিক ও দলীয়করণের ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা করলে ১৭ বছরের আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তিনি অবিলম্বে রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ, সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এবং জাতীয় যুব শক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম। বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে রাষ্ট্র এখনো কোটাভিত্তিক ব্যবস্থার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় কার্যালয়ে রূপান্তর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে বক্তারা অবিলম্বে দলীয় নিয়োগ বন্ধ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার দাবি জানান। ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশের আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাইযোদ্ধা এবং প্রকৌশলী সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত, শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হয়।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
