সড়ক দুর্ঘটনা ও এর ফলে সৃষ্ট প্রাণহানি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বমঞ্চে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বাংলাদেশ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈশ্বিক ঘোষণার সঙ্গে সংগতি রেখে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে সরকার। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যমান সড়ক পরিকাঠামোর উন্নয়ন, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং চালক ও পথচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র ও নীতি-নির্ধারকদের মতে, সড়ক নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন এবং উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের সড়ক-মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা বা ‘ব্ল্যাক স্পট’গুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর দ্রুত সংস্কার করা এবং মহাসড়কগুলোকে পর্যায়ক্রমে চার লেনে উন্নীত করা। এছাড়া, মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদার করতে হাইওয়ে পুলিশের জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
তবে সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুহার ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার এই লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং এটি অর্জন করতে হলে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমানে দেশে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল এবং ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকের আধিক্য সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত। একই সঙ্গে, দূরপাল্লার ভারী যানবাহন চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও মানসিক ক্লান্তি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তাদের শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতো বিভিন্ন নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মতে, কেবল রাস্তাঘাট প্রশস্ত করলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়, বরং সড়ক আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন এবং এর সংশোধিত বিধিমালাগুলো পুরোপুরি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে, আধুনিক ট্রাফিক সংকেত ব্যবস্থা চালু করা এবং মহাসড়কগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা (এআই ট্রাফিক মনিটরিং) জোরদার করা গেলে আইন অমান্যকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলার এই লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদেরও পাশে পাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে। এই প্রকল্পের আওতায় মহাসড়কগুলোতে আধুনিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম স্থাপন, চালকদের পেশাদারিত্বের মানোন্নয়ন এবং সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদানে ট্রমা সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে মহাসড়কগুলোর পাশে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করাও সরকারের এই মহাপরিকল্পনার একটি অন্যতম অংশ।
সর্বোপরি, সড়ক নিরাপত্তাকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে ট্রাফিক আইনের মৌলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা এবং পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন। ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সরকার, পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ও সময়োপযোগী প্রয়াস নিশ্চিত করা গেলে দেশের সড়ক যোগাযোগ খাতে এক বৈপ্লবিক এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
