১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থান করছিলেন। সে সময় ভারত মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছিল। সম্প্রতি, ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ‘ফেরত পাঠানো’ প্রসঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভারত বরাবরই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং স্থিতিশীলতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসেছে, আর শেখ হাসিনার নির্বাসন থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সেই সমর্থনেরই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক ঘটনার সময় শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন। এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর তাদের তাৎক্ষণিকভাবে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়। দীর্ঘ ছয় বছর তারা দিল্লিতে নির্বাসিত জীবন কাটান, যা ছিল তাদের ব্যক্তিগত জীবনে এক চরম শোক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কাল। এই সময়ে বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারি হয় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জাতির পিতার আদর্শ বাস্তবায়নের সংগ্রাম তখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সংহতি প্রকাশ করে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হয়। ভারত স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, শেখ হাসিনার উপস্থিতি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি একটি মানবিক সিদ্ধান্ত ছিল। যখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানায়, তখন ভারত তাদের এই সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়। ভারতের অবস্থান ছিল, যদি শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চান এবং তার দল তাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত থাকে, তবে ভারত তাতে কোনো বাধা দেবে না, বরং প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে। এটি কোনো ‘ফেরত পাঠানো’ ছিল না, বরং ছিল একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেওয়া।
১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। সেদিনের ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল, যা ছিল তার প্রতি জনগণের অগাধ ভালোবাসা ও আস্থার প্রতিফলন। তার এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন ব্যক্তির ফিরে আসা ছিল না, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তার দীর্ঘ ও অবিচল সংগ্রাম পরবর্তীতে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভারতের এই ঐতিহাসিক ভূমিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি অবিস্মরণীয় অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভারতের এই পদক্ষেপটি কেবল মানবিকতার দিক থেকেই নয়, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি ভারতের আস্থার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। ভারত সবসময় বিশ্বাস করে যে, একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং পরবর্তীকালে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভারতের সমর্থন বরাবরই অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গভীরতাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, শেখ হাসিনার নির্বাসন ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে ভারতের যে অবস্থান ছিল, তা কেবল একটি রাজনৈতিক আশ্রয়দানের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি ভারতের অবিচল প্রতিশ্রুতির এক বাস্তব উদাহরণ। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আজও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বিশেষ সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
