প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান গুগল তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে ফের আইনি জটিলতায় জড়িয়েছে। হ্যাচেট, সেনগেজ এবং এলসেভিয়ারের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা গুগলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে যে, তাদের এআই মডেল তৈরিতে স্বত্বাধিকার সুরক্ষিত (copyrighted) কাজগুলো বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এই মামলাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেধা সম্পত্তির অধিকারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
নিউইয়র্কের একটি আদালতে দায়ের করা এই মামলার মূল অভিযোগ হলো, গুগল তার বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম) যেমন জেমিনিকে প্রশিক্ষণ দিতে প্রকাশকদের প্রকাশিত বই, নিবন্ধ এবং অন্যান্য কন্টেন্ট বেআইনিভাবে ব্যবহার করেছে। প্রকাশকরা দাবি করেছেন যে, গুগলের এআই মডেল এই স্বত্বাধিকারযুক্ত উপাদান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে মানুষের মতো পাঠ্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা তাদের অনুমতি এবং কোনো রকম ক্ষতিপূরণ ছাড়াই করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, তাদের প্রকাশিত এই কাজগুলোই গুগলের এআই মডেলের বুদ্ধিমত্তা এবং ক্ষমতা তৈরিতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে এর প্রশিক্ষণ ডেটা নিয়ে মেধা সম্পত্তির অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। শুধু গুগল নয়, ওপেনএআই, মাইক্রোসফট এবং স্টেबिलिटी এআই-এর মতো অন্যান্য প্রধান এআই ডেভেলপারদের বিরুদ্ধেও লেখক, শিল্পী এবং সংবাদ সংস্থাগুলো একই ধরনের অভিযোগ এনেছে। এআই মডেলগুলি তথ্যের বিশাল ভান্ডার থেকে শিখতে পারে, যা প্রায়শই ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই ডেটার মধ্যে স্বত্বাধিকার সুরক্ষিত কাজও অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা নিয়ে এখন আইনি বিতর্ক তুঙ্গে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলি প্রায়শই ‘ন্যায্য ব্যবহার’ (fair use) নীতির অধীনে এই ডেটা ব্যবহারের যুক্তি দেয়, কিন্তু কন্টেন্ট নির্মাতারা মনে করেন এটি তাদের সৃষ্টিশীল কাজের বাণিজ্যিক মূল্যকে অবমূল্যায়ন করছে।
প্রকাশনা সংস্থাগুলি এই মামলার মাধ্যমে তাদের মেধা সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত করতে চাইছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, যদি এআই মডেলগুলি বিনা অনুমতিতে তাদের কন্টেন্ট ব্যবহার করতে থাকে, তবে এটি প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যত এবং লেখকদের জীবিকাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে। তাদের যুক্তি হলো, বই লেখা, গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করা বা শিক্ষামূলক উপকরণ তৈরি করার পেছনে প্রচুর সময়, শ্রম এবং বিনিয়োগ থাকে। এআই যদি এই কাজগুলো থেকে সরাসরি উপকৃত হয় এবং নিজস্ব কন্টেন্ট তৈরি করে, তাহলে মূল নির্মাতারা বঞ্চিত হবেন এবং তাদের কাজের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এটি একটি টেকসই বাণিজ্যিক মডেলের জন্য হুমকি।
যদিও গুগল এখনও এই নির্দিষ্ট মামলার বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি, তবে সাধারণত এআই কোম্পানিগুলো যুক্তি দেয় যে, তাদের মডেলগুলি ডেটাকে নতুন উপায়ে রূপান্তরিত করে, সরাসরি পুনরুৎপাদন করে না। তারা আরও বলে যে, এআই মডেলের প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ ডেটা অপরিহার্য এবং এটি উদ্ভাবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে, তারা ‘ন্যায্য ব্যবহার’ নীতির আওতায় তাদের কার্যক্রমকে বৈধ বলে দাবি করে, যেখানে শিক্ষামূলক বা গবেষণামূলক উদ্দেশ্যে স্বত্বাধিকারযুক্ত কন্টেন্টের সীমিত ব্যবহার অনুমোদিত। তবে, বাণিজ্যিক এআই মডেলের ক্ষেত্রে এই যুক্তি কতটা প্রযোজ্য, তা নিয়ে আইনি মহলে ভিন্ন মত রয়েছে।
এই মামলার ফলাফল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের জন্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। যদি আদালত প্রকাশকদের পক্ষে রায় দেয়, তাহলে এআই কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রশিক্ষণ ডেটার উৎস সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ হতে হবে এবং স্বত্বাধিকারযুক্ত কন্টেন্ট ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হতে পারে। এটি এআই ডেভেলপমেন্টের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে এবং নতুন এআই মডেল তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যদিকে, যদি গুগল জয়ী হয়, তবে এটি মেধা সম্পত্তির অধিকারের সংজ্ঞা এবং প্রয়োগ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করবে। এই মামলাটি এআই প্রযুক্তি এবং কপিরাইট আইনের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের ডিজিটাল বিশ্বে কন্টেন্ট তৈরি এবং ব্যবহারের নিয়মাবলী নির্ধারণে সাহায্য করবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
