জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরামে (High-Level Political Forum – HLPF) বাংলাদেশের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথে বৈশ্বিক অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই বার্তা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ২০৩০ সালের এজেন্ডা বাস্তবায়নে এবং কোভিড-১৯ মহামারি ও অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে সহজলভ্য ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন অপরিহার্য।
প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে থাকা দেশগুলোর অর্থায়ন সংক্রান্ত বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অনেক দেশই উচ্চ সুদের হার এবং কঠোর শর্তের কারণে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন অর্থায়ন পেতে হিমশিম খাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি অনেক দেশের বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি বজায় রাখা এবং দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আহ্বান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করবে। এই উত্তরণ দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এলেও, এর ফলে সহজ শর্তের ঋণ এবং বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। ড. শামসুল আলম উল্লেখ করেন, মসৃণ উত্তরণ নিশ্চিত করতে এবং টেকসই উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অব্যাহত সমর্থন ও সহজ শর্তের অর্থায়ন অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ তার নিজস্ব সম্পদ দিয়ে এসডিজি অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে, তবে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ছাড়া এই বিশাল লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব নয়।
“সহজ শর্তে অর্থায়ন” বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্য স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, এর অর্থ শুধু কম সুদের হার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী পরিশোধের সময়, নমনীয় শর্তাবলী এবং উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থার প্রবর্তন। এছাড়া, তিনি উন্নত দেশগুলোকে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৭ শতাংশ উন্নয়ন সহায়তা (ODA) হিসেবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানান। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং অভিযোজন কর্মসূচির জন্য পর্যাপ্ত ও অনুমানযোগ্য তহবিল নিশ্চিত করার গুরুত্বও তিনি তুলে ধরেন। এসব শর্ত পূরণ হলে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে পারবে।
জাতিসংঘের এই ফোরামে প্রতিমন্ত্রী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন। তিনি তাদের ঋণ প্রদানের শর্তাবলী আরও সহজ করার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানান। উন্নত দেশগুলোকে কেবল অনুদান বা ঋণ নয়, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর, জ্ঞান বিনিময় এবং বাণিজ্য সুবিধা প্রদানের মাধ্যমেও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করার কথা বলেন। এটি একটি ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো তৈরির জন্য অপরিহার্য।
জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরাম (HLPF) হলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার প্রধান বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। প্রতি বছর এই ফোরামে সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের এসডিজি অর্জনের অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা তুলে ধরে। ড. শামসুল আলমের এই আহ্বান ফোরামের মূল এজেন্ডার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, কারণ অর্থায়নের অভাব এসডিজি বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তার এই বক্তব্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক অর্থায়ন ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
পরিশেষে, প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন করতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সুসংগঠিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য, অসমতা এবং জলবায়ু সংকটের মতো সমস্যাগুলো আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, তার এই আহ্বান আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলবে এবং বৈশ্বিক উন্নয়নের পথে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
