বাংলাদেশকে ভোজ্যতেলের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করে। এই নির্ভরতা কমাতে সরকার সরিষা চাষ বৃদ্ধিতে জোর দিলেও, দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যা বা ‘পুরোনো ভূত’ এখনো এই খাতের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি, উন্নত বীজের অভাব, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা—এই সব মিলিয়ে সরিষা চাষিদের জন্য একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। দেশের কৃষকরা সরিষা চাষে উৎসাহিত হলেও, তাদের সামনে বারবার একই ধরনের প্রতিবন্ধকতা ফিরে আসছে, যা দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদন বৃদ্ধির সরকারি লক্ষ্য পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৩ থেকে ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশের মতো দেশীয় উৎস থেকে পূরণ হয়, বাকি ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। সয়াবিন ও পাম তেলের ওপর এই ব্যাপক নির্ভরশীলতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা দেশের ভোক্তাদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে, সরকার দেশীয় সরিষা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কৃষকদের বিনামূল্যে উচ্চ ফলনশীল সরিষার বীজ ও সার বিতরণ, উন্নত প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এইসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো আগামী তিন বছরের মধ্যে ভোজ্যতেলের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশে উন্নীত করা।
তবে, সরকারের এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সরিষা চাষে কিছু মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে। প্রথমত, আমদানিকৃত সয়াবিন ও পাম তেলের তুলনায় দেশীয় সরিষার তেলের উৎপাদন খরচ বেশি এবং বাজারে এর দামও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে অনেক সময় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত সরিষার ন্যায্য মূল্য পান না, যা তাদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, উন্নত জাতের সরিষা বীজের অপ্রতুলতা এবং রোগবালাই দমনে আধুনিক প্রযুক্তির অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক কৃষক এখনও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে চাষাবাদ করেন, যার ফলে ফলন কম হয়। তৃতীয়ত, ফসল তোলার পর সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঠিক অবকাঠামোর অভাবও কৃষকদের ভোগান্তি বাড়ায়। চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বা খরার কারণেও সরিষা চাষ ব্যাহত হয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরিষা চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ এবং প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা চান। একই সাথে, তারা চান উৎপাদিত সরিষার একটি স্থিতিশীল ও লাভজনক বাজার মূল্য। যখন তারা দেখেন যে, তাদের কষ্টের ফসল বিক্রি করে উৎপাদন খরচও উঠছে না, তখন তারা সরিষা চাষের পরিবর্তে অন্য লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতি শুধু কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাকেই প্রভাবিত করে না, বরং জাতীয় পর্যায়ে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যকেও বাধাগ্রস্ত করে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধুমাত্র প্রণোদনা দিলেই হবে না, বরং একটি সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরিষা চাষের ‘পুরোনো ভূত’ তাড়াতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। উচ্চ ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন সরিষার নতুন জাত উদ্ভাবন ও সহজলভ্য করা, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, এবং সময়োপযোগী বাজার নীতি প্রণয়ন করা অপরিহার্য। এছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে সরিষা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সরিষা কেনার ব্যবস্থা করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে উন্নত সংরক্ষণাগার ও তেল নিষ্কাশন কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। একই সাথে, সরিষার তেলের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করলে এর চাহিদা বাড়বে, যা কৃষকদের আরও উৎসাহিত করবে।
পরিশেষে বলা যায়, ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরিষা চাষের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় স্বাবলম্বী হতে হলে সরিষা চাষের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা আবশ্যক। ‘পুরোনো ভূত’ তাড়ানোর এই যুদ্ধে সরকার, কৃষক এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে, তবেই দেশীয় সরিষা উৎপাদন তার পূর্ণ সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাবে এবং ভোজ্যতেলের বাজারে বাংলাদেশ স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
