ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক মর্মান্তিক ঘটনায় ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এই নৃশংস ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতায় রূপ নেয়। রবিবার (৫ জুলাই, ২০২৬) সকাল থেকেই বারুইপুর এলাকার সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। এই গণবিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়। এরই মধ্যে বিক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বিকেলে বারুইপুর থানার ধপধপি এলাকার সূর্যপুর হাটে ১২ বছর বয়সী ওই শিশু খাবার কিনতে গিয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে যে, সেখান থেকে চার যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ ডায়েরি করা হলেও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে মেয়েটির সন্ধান লাভে ব্যর্থ হয়। রবিবার সকালে বাড়ির কাছে একটি পুকুর থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় শিশুটির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন।
মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই এলাকার সর্বস্তরের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। তারা শিশুটির মরদেহ জাতীয় সড়কে রেখে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন। সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়, যার ফলে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে শিয়ালদহ-নামখানা রুটের ট্রেন চলাচলও স্তব্ধ হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের উপর চড়াও হয়। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। বারুইপুরের এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের টহল জোরদার করা হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ) শঙ্কর প্রসাদ বারুই। তিনি মাইকে ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তির আশ্বাস দেন। আইজি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কোনো অপরাধীই পার পাবে না এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এই আশ্বাসের পরও অবশ্য জনতার ক্ষোভ পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
বিক্ষোভ চলাকালীনই উত্তেজিত জনতা এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ধরে ফেলে এবং তাকে বেধড়ক মারধর শুরু করে। গণপিটুনির শিকার হয়ে ওই ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এই ঘটনায় এলাকায় এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ এই ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। বারুইপুরের সূর্যপুরহাট এলাকায় সড়ক ও আশপাশের ভবনের ছাদে জড়ো হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা এখনও এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের ইঙ্গিত দেয়।
এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্তের জন্য বারুইপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (অ্যাডিশনাল এসপি) নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। এই দলের সদস্যরা ইতিমধ্যেই তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছেন। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিহত শিশুর বাবার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। তিনি পিতাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন যে, তিনি আগামী মঙ্গলবার কলকাতার ভবানী ভবনে (সিআইডির প্রধান কার্যালয়) নিহত শিশুর বাবার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করবেন। এই উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ধরনের ঘটনা সমাজে শিশু সুরক্ষার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বারুইপুরের এই ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় অপরাধ নয়, এটি সমাজের প্রতি এক গুরুতর বার্তা। জনগণের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা যেমন আশঙ্কাজনক, তেমনি নৃশংস অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এই ঘটনায় নিহত শিশুর পরিবার এবং সমগ্র এলাকার মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
