সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি কাতারের উপহার দেওয়া একটি নতুন ব্যক্তিগত জেটে চড়ে প্রথম যাত্রা করেছেন, যা তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এই বিলাসবহুল বিমানটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উপহাসের শিকার হয়েছেন তিনি এর অভ্যন্তরে দেখা যাওয়া একটি তথাকথিত ‘লাইব্রেরি’র কারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই ‘নকল বইয়ের তাক’ নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও বিদ্রূপ শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, কাতারের তরফ থেকে ট্রাম্পকে এই বিশাল ও অত্যন্ত বিলাসবহুল ব্যক্তিগত জেটটি উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। যদিও এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর মতো রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত হবে না, এটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হবে। এই ধরনের উপহার সাধারণত দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সখ্যতা তৈরির একটি উপায় হিসেবে দেখা হয়। বিমানটির অভ্যন্তরীণ সজ্জা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন, যা ব্যক্তিগত জেট হিসেবে এর উচ্চমানকে নির্দেশ করে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিমানটির ভিতরে থাকা একটি কক্ষ, যেখানে সারি সারি বইয়ের তাক দেখা গেছে। তবে ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, এই বইগুলো মূলত সজ্জার উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে এবং সেগুলোর প্রচ্ছদ বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেক পর্যবেক্ষক এটিকে ‘নকল লাইব্রেরি’ বা ‘শুধুই শো-পিস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সমালোচকরা বলছেন, এটি ট্রাম্পের ভাবমূর্তি তৈরির একটি প্রচেষ্টা, যেখানে তিনি নিজেকে একজন জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, কিন্তু তা কৃত্রিমতার দোষে দুষ্ট। এই ঘটনাকে অনেকেই ট্রাম্পের অতীত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে তার বিরুদ্ধে ‘ভঙ্গুরতা’ এবং ‘উপরিতল’ প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত বিমানের সম্পর্ক বেশ পুরোনো। তার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিনি বর্তমান এয়ার ফোর্স ওয়ান বহরের নতুন সংস্করণের ডিজাইন এবং খরচের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। তিনি বোয়িং ৭৪৭-৮ মডেলের নতুন বিমানগুলোর জন্য একটি নতুন লাল, সাদা ও নীল রঙের নকশার প্রস্তাব করেছিলেন, যা ঐতিহ্যবাহী আকাশী নীল ও সাদা রঙের থেকে ভিন্ন ছিল। সেই সময় বিমান কেনার খরচ নিয়েও তার উদ্বেগ ছিল। তাই, তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একটি বিলাসবহুল জেট উপহার পাওয়া এবং সেটির অভ্যন্তরীণ সজ্জা নিয়ে তার আগ্রহ স্বভাবতই সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
এই ব্যক্তিগত জেটটি, যদিও আকারে বড় এবং বিলাসবহুল, কার্যকারিতার দিক থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এয়ার ফোর্স ওয়ান কেবল একটি বিমান নয়, এটি একটি উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার, যা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এমনকি চিকিৎসা সুবিধা দিয়ে সজ্জিত। এর বিপরীতে, কাতারের উপহার দেওয়া বিমানটি মূলত ব্যক্তিগত আরাম ও আতিথেয়তার জন্য নকশা করা হয়েছে। একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট কর্তৃক এমন একটি উপহার গ্রহণ এবং এর প্রদর্শন জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এটি একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাতার ও ট্রাম্পের মধ্যকার ঘনিষ্ঠতা ইঙ্গিত করে, অন্যদিকে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং তার ভাবমূর্তি তৈরির প্রচেষ্টার দিকটিও তুলে ধরে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এই ‘নকল লাইব্রেরি’র ছবি পোস্ট করে ব্যাপক উপহাস করছেন। অনেকে ঠাট্টা করে বলেছেন যে, ট্রাম্প হয়তো বইগুলোর পাতা উল্টানোরও সময় পাননি, অথবা সেগুলো নিছকই সাজসজ্জার অংশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, যেমন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং বিজনেস ইনসাইডার, এই ঘটনাটিকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছে এবং ট্রাম্পের এই নতুন বিমান ও তার ‘লাইব্রেরি’ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, তার ‘অদ্ভুত বাগ্মীতা’ নিয়েও কিছু গণমাধ্যম প্রশ্ন তুলেছে, যা সম্ভবত এই উপহারের উৎস বা বিলাসিতা সম্পর্কে তার মন্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই ঘটনা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনমানসে তার বিতর্কিত ভাবমূর্তি আরও একবার স্পষ্ট করেছে। তার অনুরাগী এবং সমালোচক উভয়ই এই ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। একদিকে যেমন তার সমর্থকরা এটিকে তার সাফল্য ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রতীক হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে সমালোচকরা এটিকে তার ব্যক্তিগত প্রদর্শনীমূলক আচরণের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই নতুন বিমান এবং এর ভেতরের ‘নকল লাইব্রেরি’ আগামী দিনেও ট্রাম্পকে ঘিরে আলোচনা ও বিতর্কের খোরাক জোগাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
