ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়া এক ভয়াবহ ও ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার ফলে অন্তত ২১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ছিল, যা শহরের বেসামরিক অবকাঠামো এবং আবাসিক এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে। হামলার তীব্রতা এতটাই ছিল যে কিয়েভের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আকাশজুড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিটসকো এবং অন্যান্য ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, রাশিয়া শাহেদ-শৈলীর ড্রোন এবং বিভিন্ন ধরনের ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকা। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও, অনেকগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। ভোরবেলায় ঘুমন্ত নগরীর ওপর এই আকস্মিক আক্রমণ নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
এই হামলায় নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আহতদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিতদের উদ্ধারের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। কিয়েভের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে শেভচেঙ্কিভস্কি, পোডিলস্কি এবং স্ভিয়াতোশিনস্কি জেলায়, অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, দোকানপাট এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাও আংশিকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এই হামলা ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসনের একটি অংশ। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রাশিয়া নিয়মিতভাবে ইউক্রেনের শহরগুলোতে, বিশেষ করে কিয়েভে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। তবে এবারের হামলা তার ব্যাপকতা এবং প্রাণহানির দিক থেকে অন্যতম গুরুতর। ইউক্রেনীয় সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের হামলা ইউক্রেনের মনোবল ভাঙার এবং সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। মে মাসের পর এটি কিয়েভে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে আরও উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এই হামলা ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার এই আক্রমণকে “সন্ত্রাসী কার্যকলাপ” বলে অভিহিত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
হামলার পর কিয়েভের বাসিন্দারা শোক ও ক্ষোভের পাশাপাশি দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দ্রুত পুনর্গঠন এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায়, এই ধরনের হামলা ভবিষ্যতে আরও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ইউক্রেন তার সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় অবিচল থাকবে বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
