খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালে এথেন্সের এক আদালতকক্ষে সত্তর বছর বয়সী দার্শনিক সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও বিতর্কিত অধ্যায়। হেমলক বিষ পানের মাধ্যমে তাঁর জীবনাবসান কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন এথেনীয় রাজনীতির এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধে স্পার্টার কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর এথেন্সে প্রতিষ্ঠিত অলিগার্কিক বা ধনিকতান্ত্রিক জান্তা ‘ত্রিশ স্বৈরশাসক’-এর নৃশংসতা শহরটিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। সক্রেটিসের বিচারের প্রেক্ষাপট ছিল এই রাজনৈতিক অস্থিরতারই একটি ধারাবাহিকতা।
সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনটি—রাষ্ট্রীয় দেবতাদের অস্বীকার করা, নতুন দেবতার প্রবর্তন এবং যুবকদের বিপথগামী করা। তবে ঐতিহাসিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর আড়ালে ছিল গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। ৪০৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর এথেন্সে একটি ‘সাধারণ ক্ষমা’ বা অ্যামনেস্টি ঘোষণা করা হয়েছিল, যার ফলে সরাসরি রাজনৈতিক কারণে কাউকে অভিযুক্ত করা সম্ভব ছিল না। এই আইনি সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে সক্রেটিসকে প্রতীকী বলির পাঁঠা বানানো হয়। অভিযোগকারীরা তাঁর দুই প্রাক্তন ছাত্র—ক্রিটিয়াস এবং অ্যালসিবিয়াদেসের নাম ব্যবহার করে তাঁকে স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন, যদিও সক্রেটিসের দর্শন ছিল সর্বদা ক্ষমতার সমালোচনা ও সত্যের অনুসন্ধান।
সক্রেটিসের জীবন ও দর্শন ছিল তৎকালীন ক্ষমতাবানদের জন্য অস্বস্তিকর। তিনি কোনো নির্দিষ্ট স্কুল বা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত না থেকে বাজারে ঘুরে সাধারণ মানুষের সাথে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, অপরীক্ষিত জীবন যাপনের কোনো মূল্য নেই। তাঁর এই স্বাধীন চিন্তাধারা ও গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাঁকে শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূলে পরিণত করেছিল। এমনকি বিচারের মুখোমুখি হয়েও তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেননি, বরং নিজের অবস্থানে অটল থেকে দার্শনিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন।
তৎকালীন ৫০১ জন বিচারকের রায়ে মাত্র ৫৯ ভোটের ব্যবধানে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। মৃত্যুদণ্ডাদেশের পরেও তাঁর কাছে পালানোর সুযোগ ছিল, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। প্লেটোর ‘ক্রিটো’ সংলাপে বর্ণিত হয়েছে যে, সক্রেটিস রাষ্ট্রের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এবং নিজের নৈতিক চুক্তির প্রতি অটল থেকে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই পরিণতি আজও প্রশ্ন তোলে—সক্রেটিস কি সত্যিই স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন, নাকি তিনি নিছকই তৎকালীন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও জনতুষ্টির রাজনীতির বলি হয়েছিলেন? ইতিহাসের পাতায় সক্রেটিসের এই বিচার আজও ক্ষমতার সাথে সত্যের চিরন্তন সংঘাতের এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে টিকে আছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
