বর্ষা ঋতুর আগমনে সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চল তার চিরচেনা রূপ ধারণ করার কথা থাকলেও, এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রী লেক, যাদুকাটা নদী এবং বারেক টিলার মতো দর্শনীয় স্থানগুলো প্রতি বছর এই সময়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকলেও, চলতি মৌসুমে সেখানে বিরাজ করছে এক অদ্ভুত নীরবতা। ঈদের ছুটির পর থেকে প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক না আসায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন হাউসবোট মালিক, নৌকার মাঝি এবং পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। পর্যটক সংকটের পাশাপাশি হাওরে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কম থাকাও এই স্থবিরতার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, গত কয়েক বছরে হাওরকেন্দ্রিক হাউসবোট ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটলেও এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বুকিংয়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। অমিত রায় নামক এক ব্যবসায়ী জানান, অন্য বছর এই সময়ে হাওরজুড়ে লাখো মানুষের ভিড় থাকত, কিন্তু এবার সেই তুলনায় পর্যটকের দেখা মেলা ভার। এর ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। একই পরিস্থিতির শিকার স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও, যারা ছোট ডিঙি নৌকা চালিয়ে বা চা-বিস্কুট ও খাবার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পর্যটক শূন্যতায় তাদের সংসার চালানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে এই পর্যটক সংকটের পেছনে পরিবেশগত সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সুনামগঞ্জের সচেতন মহল এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, পর্যটন শিল্পের নামে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। অনিয়ন্ত্রিত হাউসবোট চলাচল, জেনারেটরের বিকট শব্দ এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ‘হাওর নদী রক্ষা আন্দোলন’-এর মতো সংগঠনগুলোর দাবি, পর্যটনের নামে হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করা হয়েছে, যার ফলে দর্শনার্থীরাও এখন আগ্রহ হারাচ্ছেন।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান সাকিব জানান, হাউসবোটগুলোর চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং উচ্চ শব্দে গানবাজনা বা পরিবেশ দূষণকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, এবার বর্ষা দেরিতে আসায় পানির প্রবাহ কম ছিল, যা পর্যটনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটন শিল্পের ভারসাম্য বজায় রেখে এই খাতকে ভবিষ্যতে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে, সুনামগঞ্জের পর্যটন শিল্প এখন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্য তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
