Tuesday , June 30 2026
Breaking News
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা জাদুঘর: কাচের জারে বন্দি শত বছরের জীবন্ত ইতিহাস

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা জাদুঘর: কাচের জারে বন্দি শত বছরের জীবন্ত ইতিহাস

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু অ্যাকাডেমিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক অসাধারণ সংগ্রহশালা – ‘অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’। কাচের স্বচ্ছ জারে সংরক্ষিত শত শত নিথর প্রাণীর নমুনা, বিরল সরীসৃপ, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেহাবশেষ, কোটি বছরের পুরোনো জীবাশ্ম এবং মানুষের কঙ্কাল নিয়ে এটি ধারণ করে আছে প্রকৃতির শত শত বছরের অজানা ইতিহাস। দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ এই প্রাণিবিদ্যা জাদুঘরটি জীববৈচিত্র্য, বিবর্তন এবং বিলুপ্তির দীর্ঘ ইতিহাসকে নিঃশব্দে বহন করলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ দশক পেরিয়েও এর অস্তিত্ব অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক এমনকি রাজশাহীর সাধারণ মানুষের কাছেও প্রায় অজানা রয়ে গেছে।

১৯৭২ সালে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রয়াত শিক্ষক অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমানের ঐকান্তিক উদ্যোগে এই জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাদুঘরটির নামকরণ করা হয়। এটি কেবল একটি প্রদর্শনী কক্ষ নয়, বরং জীবজগতের বিবর্তন এবং বিলুপ্তির নীরব সাক্ষী। এখানে সংরক্ষিত প্রতিটি নমুনা যেন পৃথিবীর প্রাণিকুলের এক একটি গল্প তুলে ধরে। পরিফেরা পর্ব থেকে শুরু করে স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রায় সব প্রধান পর্বের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এই সংগ্রহে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।

জাদুঘরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে বনরুই, সজারু, উদবিড়াল, বিভিন্ন প্রজাতির বিড়াল, মাছরাঙা, বিরল সাপ, কুমির, শুশুক, ডলফিন, সামুদ্রিক ও মিঠাপানির মাছ, প্রবাল, কোরাল, মলাস্কা এবং অসংখ্য কীটপতঙ্গের প্রক্রিয়াজাত নমুনা। এছাড়াও রয়েছে মানবভ্রূণ, মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং নারী-পুরুষের দুটি পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল। শুধু তাই নয়, হাতি, ঘোড়া ও কুমিরের বিশাল কঙ্কাল যেমন এখানে স্থান পেয়েছে, তেমনি জীবন্ত ফসিল হিসেবে পরিচিত কিছু বিরল প্রাণীর নমুনাও সংরক্ষিত আছে। বর্তমানে ১ হাজার ৫৪৩টি প্রক্রিয়াজাত প্রাণীর নমুনা এবং ১৪২টি দুর্লভ জীবাশ্ম এখানে যত্নের সাথে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যা গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা জাদুঘর থাকলেও, সংগ্রহের বৈচিত্র্য ও পরিসরের দিক থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জাদুঘরটি গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি বিভাগের ব্যবহারিক ক্লাস ও গবেষণা কার্যক্রম এখানকার সংগ্রহ ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, “বইয়ে যেসব প্রাণী আমরা শুধু নাম ও ছবি হিসেবে পড়েছি, এখানে এসে সেগুলো বাস্তবে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বিশেষ করে জীবাশ্মগুলো দেখে মনে হয়েছে আমরা যেন ইতিহাসের অনেক গভীরে চলে গেছি।” তবে তিনি আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে পাখি নিয়ে গবেষণা করা প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুজ্জামান মো. সালেহ্ রেজা এই সংগ্রহকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “এখানে শুধু সাধারণ প্রাণী নয়, বরং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি, দুর্লভ জীবাশ্ম এবং স্থলজ, জলজ ও সামুদ্রিক প্রাণীর বিপুলসংখ্যক নমুনা অত্যন্ত যত্নসহকারে সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংগ্রহশালা শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে।” প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলামও এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞানী ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা এই জাদুঘরের সংগ্রহকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও মানসম্পন্ন বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

তবে এই অমূল্য সংগ্রহশালাটি বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে চলছে। মিউজিয়াম অ্যাটেনডেন্ট কেতাব আলী জানান, সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ফরমালিন এবং দক্ষ ট্যাক্সিডার্মিস্টের অভাব রয়েছে, যা অনেক নমুনা সংরক্ষণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এছাড়াও, প্রদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় অনেক মূল্যবান সংগ্রহ দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ বলছেন, জায়গার সংকট ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে জাদুঘরটিকে আধুনিক রূপ দেওয়া যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় প্রকল্প ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রদর্শনীকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

প্রচারণার অভাবে এই সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা আজও লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে। শুক্র ও শনিবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য পাঁচদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে এবং অনুমতি সাপেক্ষে দর্শনার্থীরা এটি ঘুরে দেখতে পারেন। জাদুঘর পরিদর্শন করা শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন, “এখানে প্রতিটি নমুনার মধ্যে একটি গল্প আছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেকেই জানে না বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এমন একটি সমৃদ্ধ জাদুঘর আছে। প্রচার বাড়ানো দরকার।” জীববৈচিত্র্যের ইতিহাস, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর স্মৃতি এবং গবেষণার অমূল্য উপাদান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই জাদুঘরটি যথাযথ পরিচর্যা ও প্রচার পেলে দেশের প্রাণিবিজ্ঞান গবেষণায় এক অনন্য জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে।

এছাড়াও

অধ্যাপক মামুন হাবিব এসিবিএসপির মেম্বার রিলেশনস কমিটির চেয়ার: বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব

অধ্যাপক মামুন হাবিব এসিবিএসপির মেম্বার রিলেশনস কমিটির চেয়ার: বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. মামুন হাবিব যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ফর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *