চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে গভীর রাতে এক ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনায় পাথরবোঝাই একটি লাইটার জাহাজ ডুবে গেছে। ঘন কুয়াশার কারণে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি লাইটার জাহাজের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। তবে আশার কথা হলো, দুর্ঘটনার পর সাগরে পড়ে যাওয়া জাহাজের ১২ জন নাবিককেই দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের পর অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা এক অলৌকিক ঘটনা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সোমবার (২৯ জুন) দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে চট্টগ্রাম বন্দরের ২ ও ৩ নম্বর বয়ার মাঝামাঝি এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে, যা বন্দরের নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আবারও আলোচনায় এনেছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার হওয়া পাথরবোঝাই লাইটার জাহাজটির নাম ছিল ‘এমভি বে হারবার-২’। গভীর রাতের ঘন কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা একেবারেই কমে যাওয়ায় বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি লাইটার জাহাজের সঙ্গে এর মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় ‘এমভি বে হারবার-২’ এর খোলে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। দ্রুতগতিতে জাহাজের ভেতরে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল আকৃতির এই জাহাজটি সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে যায়। জাহাজটিতে থাকা বিপুল পরিমাণ পাথর এর দ্রুত ডুবে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংঘর্ষের পর জাহাজটি যখন দ্রুত ডুবে যাচ্ছিল, তখন জাহাজে থাকা ১২ জন নাবিক জীবন বাঁচাতে উত্তাল সাগরে ঝাঁপ দেন। রাতের আঁধার, তীব্র স্রোত এবং শীতের মৌসুমে সমুদ্রের ঠাণ্ডা পানিতে পড়ে গিয়ে তাদের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে জীবিত ফিরে আসার আশা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে আসে। তবে, তাদের ভাগ্যে অন্য কিছু লেখা ছিল।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের একটি চৌকস উদ্ধারকারী দল দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। অত্যাধুনিক মেটাল শার্ক এবং বিশেষ উদ্ধারকারী বোট নিয়ে তারা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কোস্ট গার্ডের নিরলস প্রচেষ্টায় দুর্ঘটনাস্থল থেকে আটজন নাবিককে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়।
তবে বাকি চারজন নাবিক তীব্র স্রোতের কারণে মূল দুর্ঘটনাস্থল থেকে বেশ খানিকটা দূরে ভেসে যান। রাতের অন্ধকারে তাদের খুঁজে পাওয়া ছিল আরও কঠিন। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই আনোয়ারা উপজেলার পারকি সমুদ্রসৈকত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে তাদের ভাসমান অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয় জেলেরা এবং সৈকতে উপস্থিত লোকজন। মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তারা দ্রুত এগিয়ে আসেন এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ওই চারজন নাবিককেও নিরাপদে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন। স্থানীয়দের এই তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. নাছির উদ্দিন ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে জানান, পাথরবোঝাই লাইটার জাহাজটি ডুবে গেলেও চট্টগ্রাম বন্দরের মূল চ্যানেলে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন যে, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি মূল চ্যানেল থেকে কিছুটা দূরে ডুবে যাওয়ায় অন্যান্য বড় জাহাজের চলাচলে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়নি। তবে, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওই এলাকায় নৌযানগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চলাচল করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং দুর্ঘটনাস্থলে লাল বয়া স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সচিব আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে উদ্ধারকৃত সকল নাবিক সুস্থ ও নিরাপদ রয়েছেন এবং তাদের পরিবারকে খবর দেওয়া হয়েছে। ডুবে যাওয়া জাহাজটি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় আইনি ও কারিগরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ভবিষ্যতে বন্দরের নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান। ঘন কুয়াশার মধ্যে জাহাজ চলাচলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। প্রতিদিন এই চ্যানেল দিয়ে শত শত ছোট-বড় জাহাজ চলাচল করে। তাই এই চ্যানেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ঘন কুয়াশা, তীব্র স্রোত এবং অত্যধিক নৌযান চলাচল প্রায়শই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো যে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় নৌ-নিরাপত্তা বিধিনিষেধ কঠোরভাবে মেনে চলা এবং আধুনিক নেভিগেশনাল যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোস্ট গার্ড এবং স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১২ জন নাবিকের জীবন রক্ষা পাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
