ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের জন্য ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’ বজায় রাখা এক অপরিহার্য লক্ষ্য। এটি কেবল দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রধান শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা, বাংলাদেশকে তার পররাষ্ট্রনীতিতে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে উৎসাহিত করে।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি শত্রুতা নয়’—এই মূলনীতি অনুসরণ করে আসছে। এই নীতিই ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’র ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ কোনো একটি নির্দিষ্ট বৃহৎ শক্তির বলয়ে আবদ্ধ না হয়ে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিভিন্ন অংশীদারের সাথে কাজ করতে আগ্রহী, তবে তা কোনো শর্তাধীন রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে নয়।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার এবং বাণিজ্যিক সহযোগী। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। এসব প্রকল্পে সহযোগিতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মূল বার্তা হলো, এই সম্পর্কগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, যেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব নীতি ও অগ্রাধিকার সর্বাগ্রে থাকবে।
তবে, এই কৌশলগত স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখা সহজ নয়। আঞ্চলিক শক্তি ভারত এবং বৈশ্বিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। ভারত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী এবং ঐতিহ্যবাহী মিত্র, যার সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন সুদৃঢ়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি প্রধান উন্নয়ন অংশীদার, বিনিয়োগকারী এবং রপ্তানি গন্তব্য। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল (IPS) এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যা চীনের বিআরআই-এর বিপরীতে একটি বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ উভয় পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তার নিজস্ব পথ খুঁজে নিতে সচেষ্ট।
বাংলাদেশের জন্য ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’র অর্থ হলো, কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা পরিহার করা এবং বিভিন্ন উৎস থেকে সুবিধা গ্রহণ করা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে এবং তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব তৈরি করছে, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা হ্রাস করে।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার গুরুত্ব উপলব্ধি করে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান লক্ষ্য একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা, তবুও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষা এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখা তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের যেকোনো উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সফর বা কূটনৈতিক আলোচনায় ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’র বার্তা প্রদান দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও উন্নতির জন্য অপরিহার্য। এটি কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্যও একটি টেকসই পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি স্থাপন করবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
