অনেক সময় ছুটির দিনে নিজের ঘরে বসে যখন আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো স্ক্রল করি, তখন বন্ধুদের ঝলমলে জীবনযাত্রা দেখে নিজেদের একঘেয়ে মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের সামনে বন্ধুদের ছবি কিংবা স্কাইডাইভিংয়ের রোমাঞ্চকর ভিডিও দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে, ‘ইশ, দুনিয়ার সবাই কত আনন্দ করছে, সবার জীবন কত রঙিন! আর আমার জীবনটা কতই না পানসে।’ এমন অনুভূতি অনেকেরই হয় এবং এর জন্য সাধারণত ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমকে দায়ী করা হয়। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত এক নতুন গবেষণা এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে দেখিয়েছে যে, এই অনুভূতির জন্য অ্যালগরিদম নয়, বরং দায়ী আমাদের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেকের পাম্পলিন কলেজ অব বিজনেসের সহকারী অধ্যাপক অ্যালিস জ্যাং এবং বিজনেস ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বিশ্বনাথ ভেঙ্কটেশ যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, মানুষ স্বভাবগতভাবে বিরল, রোমাঞ্চকর এবং অসাধারণ বিষয়গুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। বাস্তব জীবনের মতোই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই একই নিয়ম প্রযোজ্য। এর ফলেই তৈরি হয় এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ, যার নামকরণ করা হয়েছে ‘রেয়ারনেস বায়াস ডিফিউশন’ বা ‘বিরলতা পক্ষপাতিত্বের বিস্তার’। এই ধারণাটি এমআইএস কোয়ার্টারলি জার্নালে বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা সমাজ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি নতুনভাবে উন্মোচন করেছে।
বিষয়টি আরও সহজ করে বোঝাতে গেলে বলা যায়, আমাদের দৈনন্দিন জীবন প্রায়শই একঘেয়ে এবং সাধারণ ঘটনায় ভরা। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা, দাঁত মাজা, যানজট পেরিয়ে অফিসে যাওয়া এবং কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা—পৃথিবীর সিংহভাগ মানুষের রুটিন এমনই। কিন্তু এই সাধারণ মুহূর্তগুলো কেউ সচরাচর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে না। মানুষ কেবল তাদের জীবনের বিরল, চমৎকার বা অসাধারণ মুহূর্তগুলোই অনলাইনে তুলে ধরে। একটি নতুন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, কোনো বিশেষ অর্জন বা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা—এগুলোই সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে জায়গা পায়, যা অন্যদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বলে মনে হয়।
সমস্যাটি তখন শুরু হয়, যখন ব্যবহারকারীরা দিনের পর দিন কেবল এই বিরল এবং আকর্ষণীয় ঘটনাগুলোই দেখতে থাকেন। মানুষের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এই বিরল ঘটনাগুলোকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। অধ্যাপক অ্যালিস জ্যাং ব্যাখ্যা করেন, “তখন মানুষ ভাবতে শুরু করে যে, বাকি সবাই হয়তো প্যারিসে ঘুরে বেড়াচ্ছে বা দারুণ সব কাজ করছে; কেবল সে নিজেই ঘরে বসে একঘেয়ে জীবন পার করছে।” এই বিভ্রমের ফলে নিজেদের জীবন অন্যদের তুলনায় নিকৃষ্ট বা কম আনন্দময় মনে হয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং হতাশার জন্ম দেয়।
এই গবেষণা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। আমরা প্রায়শই মনে করি যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমগুলো হয়তো ইচ্ছে করেই আমাদের সামনে এমন চমকপ্রদ বিষয়বস্তু তুলে ধরছে। কিন্তু সত্যটা হলো, এটি আমাদেরই সহজাত মনস্তাত্ত্বিক ত্রুটি, যেখানে আমরা নিজেরাই নতুনত্ব বা বৈচিত্র্য খুঁজে বেড়াই। সাধারণ জিনিসগুলো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। এই মানবীয় ত্রুটি বা ‘বায়াস’কেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো একটি প্যাটার্নে পরিণত করে। বিজ্ঞানীরা কেবল তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তাঁদের এই তত্ত্ব প্রমাণ করতে তাঁরা ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষা চালিয়েছিলেন।
এর মধ্যে একটি মজার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সামনে একটি কাল্পনিক শহরের গল্প তুলে ধরা হয়, যেখানে বিভিন্ন ধরনের দানব আক্রমণ করেছে। কিছু আক্রমণ দৃশ্য বারবার দেখানো হয় এবং কিছু দৃশ্য খুব কম দেখানো হয়। ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীরা অনলাইনে শেয়ার করার জন্য সেই দৃশ্যটিকেই সবচেয়ে বেশি বেছে নিয়েছেন, যা তাঁরা সবচেয়ে কম দেখেছেন। অর্থাৎ, মানুষ সবসময় সেই জিনিসটিই অন্যদের জানাতে চায়, যা একটু আলাদা, বিরল বা সচরাচর দেখা যায় না। মানুষের এই পক্ষপাতিত্ব বড় পরিসরে কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য হাজার হাজার কাল্পনিক ব্যবহারকারী দিয়ে একটি সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্কের সিমুলেশন তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে একই ফলাফল পরিলক্ষিত হয়।
তাহলে এই সমস্যার সমাধান কোথায়? অধ্যাপক অ্যালিস জ্যাংয়ের মতে, মানুষের মনের এই সহজাত ত্রুটি কোনোভাবেই পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়, কারণ পূর্ববর্তী অনেক গবেষণায় মানুষকে যতটা যৌক্তিক প্রাণী হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল, তা আদতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে বিশ্বনাথ ভেঙ্কটেশ একটি কার্যকর সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর মতে, যেহেতু এই পক্ষপাতিত্ব সম্পূর্ণরূপে দূর করা যাবে না, তাই আমাদের শুধু একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা যা দেখছি, তা মানুষের বাস্তব দৈনন্দিন জীবনের সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়, বরং এটি তাদের জীবনের কিছু বিশেষ মুহূর্তের ‘হাইলাইট’ অংশ মাত্র।
ক্রিকেট বা ফুটবল খেলার হাইলাইট ভিডিওতে যেমন সারা দিনের বোরিং মুহূর্তগুলো বাদ দিয়ে কেবল চার-ছক্কা বা গোলের মতো উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তগুলো দেখানো হয়, মানুষের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইলও ঠিক তেমনই। সবাই তাদের জীবনের শুধু ভালো, রঙিন ও ব্যতিক্রমী অংশটুকুই সেখানে তুলে ধরে। তাই, আপনার নিউজফিডে যা দেখছেন, তা বাস্তব জগতের আসল প্রতিচ্ছবি নয়—এই ছোট্ট সত্যটা একবার মন থেকে বিশ্বাস করতে পারলেই অন্যের রঙিন জীবন দেখে নিজের ভেতরে কোনো হতাশা তৈরি হবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো সম্ভবত এই পক্ষপাতিত্ব দূর করতে পারবে না, কারণ এর উৎস মানুষের নিজস্ব মনস্তত্ত্বেই নিহিত। সম্প্রতি মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতির দায়ে মেটা এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে ৩০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবের গুরুতর ইঙ্গিত বহন করে। তবে দিন শেষে এই কৃত্রিম দুনিয়ার নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজের মানসিক শান্তি রক্ষার দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
