বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আবারও তুঙ্গে উঠেছে। একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চিত, তখন এই জলপথের উপর আধিপত্য বিস্তার দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের একটি নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কৌশলগত এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৃষ্ট এই টানাপোড়েন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে। উভয় পক্ষই তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে অনড় থাকায়, পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে এবং যেকোনো ছোট ঘটনা বৃহৎ সংঘাতের কারণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সাথে সংযুক্তকারী একটি সংকীর্ণ জলপথ। এটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উল্লেখযোগ্য অংশের পরিবহনের জন্য অপরিহার্য। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার এবং ইরানের মতো প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি এই প্রণালীর উপর নির্ভরশীল। তাই, এর নিরাপত্তা ও অবাধ চলাচল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে ইরান একাধিকবার এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরেই বৈরী। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি (জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন বা জেসিপিওএ) উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের একটি সুযোগ তৈরি করলেও, ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা এবং ইরানের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে শুরু করে। এর ফলে ইরানও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়াতে থাকে। বর্তমান বাইডেন প্রশাসন চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করলেও, উভয় পক্ষের অনমনীয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে মতবিরোধ আলোচনার পথকে কঠিন করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটেই ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি falters’ বলতে সম্ভবত পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবনের আলোচনা এবং সামগ্রিক উত্তেজনা হ্রাসের প্রচেষ্টার ব্যর্থতাকে বোঝানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালী এবং এর আশেপাশের এলাকায় একাধিক ঘটনা ঘটেছে যা উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্যাঙ্কার আটক, ড্রোন হামলা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের অভিযোগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায়শই এই অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি জোরদার করে, যার মধ্যে রয়েছে নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিট, যা বাহরাইনে অবস্থিত। ইরান এটিকে তার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে, ইরান তার বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ ইউনিটের মাধ্যমে এই জলপথে নজরদারি বাড়িয়েছে এবং যেকোনো “শত্রুতা” মোকাবেলায় প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছে। এই সামরিক মহড়া এবং পাল্টা মহড়া পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তুলছে।
যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো প্রকার সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকরভাবে ভেঙে পড়ে, তাহলে হরমুজ প্রণালীতে সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে। উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইরানের কট্টরপন্থী অংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো প্রকার আপসের বিরোধী, ঠিক যেমন মার্কিন কংগ্রেসে ইরানবিরোধী একটি শক্তিশালী লবি বিদ্যমান।
এই জটিল পরিস্থিতিতে, কূটনীতিই একমাত্র পথ যা একটি সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে, যাতে উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার পথ প্রশস্ত হয়। হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ অক্ষুণ্ন রাখা সকলের স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি। তবে, দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস এবং পরস্পরবিরোধী স্বার্থের কারণে একটি কার্যকর সমাধানে পৌঁছানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশ্ব এখন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীর দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে যেকোনো ভুল পদক্ষেপের পরিণতি হতে পারে সুদূরপ্রসারী ও বিধ্বংসী।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
