মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক নৌ-যান চলাচলের উপর শুল্ক আরোপের বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে আকস্মিকভাবে সরে এসেছেন। এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাণিজ্য মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই শুল্ক আরোপের সম্ভাবনার খবরে আন্তর্জাতিক শিপিং এবং জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল, তবে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই পরিকল্পনা বাতিল করার ঘোষণা আসে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ, হরমুজ প্রণালী, পারস্য উপসাগরকে আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। বিশ্বব্যাপী তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়েই সম্পন্ন হয়, যা এটিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল করিডোর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। যেকোনো ধরনের শুল্ক আরোপ বা অবরোধের পরিকল্পনা বিশ্ব অর্থনীতির উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারত।
ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক চরম অবনতি হয়েছিল। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রত্যাহার এবং ইরানের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে উত্তেজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক তেল ট্যাংকারে হামলা এবং একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এমন একটি উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের প্রস্তাবকে অনেকেই নতুন করে সংঘাত উসকে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন।
মার্কিন প্রশাসনের এই হঠাৎ পরিকল্পনা পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক মিত্রদের তীব্র চাপ একটি বড় কারণ হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এশিয়ার প্রধান তেল আমদানিকারক দেশগুলো, এই ধরনের শুল্কের বিরোধিতা করেছিল। তাদের মতে, এটি কেবল বৈশ্বিক বাণিজ্য খরচ বাড়াবে না, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ পরামর্শ এবং সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। শুল্ক আরোপের ফলে ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা পদক্ষেপের আশঙ্কা ছিল, যা একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারত।
এছাড়াও, অর্থনৈতিক প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় ছিল। হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের ফলে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেত, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি তৈরি করত। ট্রাম্প প্রশাসন, যারা অর্থনীতিকে তাদের প্রধান সাফল্যের ক্ষেত্র হিসেবে দেখত, তারা সম্ভবত এই ধরনের নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব এড়াতে চেয়েছিল। সমালোচকরা বলছেন, এই ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অস্থিরতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রবণতাকে তুলে ধরেছে। এটি দেখায় যে, গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় চাপই কতটা কার্যকর হতে পারে।
এই ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশন (UNCLOS) অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রণালীগুলো দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন নৌ-চলাচলের অধিকার সুরক্ষিত। হরমুজ প্রণালীতে শুল্ক আরোপের যেকোনো প্রচেষ্টা এই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হত। শেষ পর্যন্ত, এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তটি আপাতদৃষ্টিতে উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হলেও, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস ও উত্তেজনা এখনও বিদ্যমান। এটি বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি কতটা নাজুক এবং একটি ভুল পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
