কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা, যিনি তার প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে মঞ্চে তার প্রাণবন্ত পারফরম্যান্সের জন্য পরিচিত, ৪৮ বছর বয়সেও একই উদ্যম ও শক্তি নিয়ে ভক্তদের মুগ্ধ করে চলেছেন। একটানা কয়েক ঘণ্টা নাচ, গান আর মঞ্চে দৌড়ঝাঁপ করার পরও তার চেহারায় ক্লান্তির লেশমাত্র থাকে না। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এই অবিশ্বাস্য প্রাণশক্তির রহস্য কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণে। এটি কোনো রাতারাতি অর্জন নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসের ফল।
শাকিরা মনে করেন, ফিটনেস কোনো ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তার মতে, শরীরকে সুস্থ রাখতে হলে না খেয়ে থাকার বদলে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা জরুরি। অনেকেই ওজন কমানোর জন্য কম খাওয়ার ভুল ধারণা পোষণ করেন, কিন্তু শাকিরার দর্শন ভিন্ন। তিনি বিশ্বাস করেন, ক্ষুধার্ত শরীর সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে পারে না। তাই তিনি এমন একটি খাদ্যতালিকা অনুসরণ করেন যা শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগান দেয়।
তার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকে উচ্চমানের প্রোটিন যেমন মাছ, ডিম এবং মুরগির মাংস। এর পাশাপাশি প্রচুর সবুজ শাকসবজি, তাজা ফল এবং অ্যাভোকাডো, অলিভ অয়েল ও বাদামের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বি তার খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাও তার রুটিনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। অন্যদিকে, অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার তিনি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলেন। শাকিরা একবারে বেশি না খেয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে পরিমিত পরিমাণে খাবার খান। এই অভ্যাস রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে, অতিরিক্ত ক্ষুধা কমায় এবং সারাদিন শরীরকে সচল ও প্রাণবন্ত রাখে। পুষ্টিবিদরাও এই ধরনের খাদ্যাভ্যাসকে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করেন।
শাকিরার ফিটনেসের আরেকটি মূল স্তম্ভ হলো বৈচিত্র্যময় শরীরচর্চা। তিনি শুধু জিমে সময় কাটানোতেই সীমাবদ্ধ নন, বরং শরীরের বিভিন্ন সক্ষমতা ধরে রাখতে একাধিক ধরনের অনুশীলন করেন। তার ওয়ার্কআউটের মধ্যে রয়েছে স্ট্রেংথ ট্রেনিং, যার মাধ্যমে তিনি পেশি শক্তিশালী রাখেন এবং শরীরকে টোনড রাখেন। এটি বয়স বাড়লেও বিপাকক্রিয়া সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। কার্ডিওর জন্য তার সবচেয়ে বড় সহায়ক হলো নাচ। লাতিন নাচ, বেলিড্যান্স এবং তার উচ্চমাত্রার স্টেজ পারফরম্যান্স শুধু শিল্প নয়, এটি তার কাছে একটি অত্যন্ত কার্যকর কার্ডিওভাসকুলার ওয়ার্কআউটও। এর পাশাপাশি দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো বা সাইক্লিংও তার হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। মঞ্চে দীর্ঘ সময় ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য শক্তিশালী ‘কোর’ পেশি অপরিহার্য, তাই প্ল্যাঙ্ক ও বিভিন্ন কোর-স্ট্যাবিলিটি অনুশীলনও তার রুটিনের অংশ। এছাড়া, প্রতিদিনের অনুশীলনের আগে ও পরে স্ট্রেচিং করতে তিনি কখনো ভুল করেন না, যা পেশির চাপ কমায়, আঘাতের ঝুঁকি হ্রাস করে এবং শরীরকে নমনীয় রাখে।
শাকিরা বিশ্বাস করেন, একদিন অতিরিক্ত পরিশ্রম করার চেয়ে প্রতিদিন নিয়ম মেনে চলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি সময়মতো ঘুমান, প্রতিদিন শরীরচর্চা করেন, পর্যাপ্ত পানি পান করেন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খান। এমনকি ব্যস্ততার মাঝেও তিনি বিশ্রাম ও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে নেন। তার মতে, বড় পরিবর্তনের শুরু হয় ছোট কিন্তু নিয়মিত অভ্যাস থেকে।
শারীরিক ফিটনেসের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাকেও শাকিরা সমান গুরুত্ব দেন। তিনি স্বীকার করেন যে কেউই প্রতিদিন শতভাগ নিয়ম মেনে চলতে পারে না। কোনো দিন হয়তো ব্যায়াম বাদ পড়তেই পারে বা পছন্দের খাবার খাওয়া যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত আবার নিয়মে ফিরে আসা। একদিনের ব্যতিক্রম পুরো যাত্রাকে ব্যর্থ করে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিকতাই ফল এনে দেয়। ব্যস্ত সময়সূচির মাঝেও তিনি পরিবার, সন্তান এবং নিজের ব্যক্তিগত সময়ের জন্য আলাদা জায়গা রাখেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ওজন বৃদ্ধি, ক্লান্তি ও ঘুমের সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই বিশ্রাম, মানসিক প্রশান্তি এবং ইতিবাচক জীবনযাপনও সুস্থ থাকার জন্য অপরিহার্য।
শাকিরার সহজ বার্তা হলো, সুন্দর শরীরের জন্য না খেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন হলো শরীরকে ভালোবাসা, সঠিক পুষ্টি দেওয়া, নিয়মিত সক্রিয় থাকা এবং প্রতিদিন নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করা। সত্যিকারের ফিটনেস আয়নার সামনে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ নয়; বরং নিজের শরীরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার নাম। ফিটনেস কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়; এটি একটি চলমান যাত্রা। আর সেই যাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নিজের শরীরকে শাস্তি নয়, যত্ন দিন। কারণ সুস্থ জীবন শুরু হয় নিজের প্রতিই যত্নশীল হওয়া থেকে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
