সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা জন্মগত নাগরিকত্বের প্রথা বাতিল করে। সুপ্রিম কোর্টে তার এই নীতি বাতিলের প্রচেষ্টার পরাজয়ের পর তিনি এই আহ্বান জানান। আদালতের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন অর্থনীতিকে ৭.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সুবিধা দিয়েছে বলে ফিনান্সিয়াল বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ অভিবাসন নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান বিতর্কের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চতুর্দশ সংশোধনীর ভিত্তিতে জন্মগত নাগরিকত্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের একটি মৌলিক অংশ। এই সংশোধনী অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া যে কোনো ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সে দেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন, জাতি, ধর্ম বা পিতামাতার অভিবাসন অবস্থা নির্বিশেষে। গৃহযুদ্ধের পর দাসত্ব থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত আফ্রিকান আমেরিকানদের অধিকার নিশ্চিত করতে ১৮৬৮ সালে এই সংশোধনী গৃহীত হয়েছিল। তবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে এই নীতির কঠোর সমালোচক। তিনি যুক্তি দেন যে, এই নীতি অবৈধ অভিবাসীদের আমেরিকায় প্রবেশ করতে এবং তথাকথিত ‘অ্যাঙ্কর বেবি’ (Anchor Baby) তৈরি করতে উৎসাহিত করে, যাদের মাধ্যমে তাদের পরিবারের সদস্যরাও একসময় নাগরিকত্ব পেতে পারে।
ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে জন্মগত নাগরিকত্ব সীমিত করার জন্য একাধিকবার নির্বাহী আদেশ জারি করার এবং আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার প্রশাসন দাবি করেছিল যে, চতুর্দশ সংশোধনীর ব্যাখ্যা পুনর্গঠন করা সম্ভব, যাতে অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের জন্মগত নাগরিকত্ব না দেওয়া হয়। তবে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এই বিষয়ে ট্রাম্পের আপিল খারিজ করে দিয়েছে। আদালত সাংবিধানিক ভিত্তিকে সমর্থন করে জন্মগত নাগরিকত্বের বর্তমান ব্যাখ্যা বহাল রেখেছে। এর ফলে, জন্মগত নাগরিকত্ব বাতিল করতে হলে সংবিধান সংশোধনের মতো একটি জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, যা আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে অত্যন্ত কঠিন।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মার্কিন অর্থনীতির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য জয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফরচুন ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জন্মগত নাগরিকত্বের কারণে মার্কিন অর্থনীতিতে ৭.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সুবিধা যোগ হয়েছে। এর কারণ হলো, জন্মগত নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছোটবেলা থেকেই সমাজের মূল স্রোতে মিশে যায়, শিক্ষা গ্রহণ করে এবং কর্মজীবনে প্রবেশ করে। তারা কর প্রদান করে, ভোক্তা হিসেবে অর্থনীতিতে অবদান রাখে এবং দেশের কর্মীবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বিশাল সংখ্যক নাগরিক দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখে, যা অভিবাসন-বিরোধী কট্টরপন্থী যুক্তির বিপরীতে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরে।
কংগ্রেসের কাছে ট্রাম্পের এই আবেদন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। রিপাবলিকান পার্টির একটি বড় অংশ ট্রাম্পের এই মনোভাব সমর্থন করে, বিশেষ করে যারা কঠোর অভিবাসন নীতি চান। তবে ডেমোক্র্যাটরা এবং উদারপন্থী দলগুলো জন্মগত নাগরিকত্বের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ধরে রেখেছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, যা বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে প্রায় অসম্ভব। এমনকি সাধারণ আইন পাসের মাধ্যমে এই নীতি বাতিল করার চেষ্টা করলেও তা সুপ্রিম কোর্টে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং সম্ভবত বাতিল হয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্পের এই আহ্বান মূলত তার রাজনৈতিক ভিত্তিকে চাঙ্গা করার এবং আসন্ন নির্বাচনে অভিবাসন ইস্যুকে মূল আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার একটি প্রচেষ্টা। এটি অভিবাসন বিতর্ককে আরও তীব্র করবে এবং আগামী মাসগুলোতে মার্কিন রাজনীতিতে এর প্রভাব দেখা যাবে। তবে, সাংবিধানিক রক্ষাকবচের কারণে জন্মগত নাগরিকত্ব বাতিল করা যে সহজ হবে না, তা স্পষ্ট।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
