Wednesday , July 1 2026
Breaking News

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে ধাক্কার পর জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য কংগ্রেসকে ট্রাম্পের আহ্বান

প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিধান বাতিলের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। এই আহ্বান এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে, যেখানে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তার প্রশাসনের আরোপিত জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ বাতিল করে দিয়েছে। আদালত সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে, যা ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই রায়ের পর ট্রাম্প কংগ্রেসকে এই দীর্ঘস্থায়ী সাংবিধানিক অধিকার বিলোপের জন্য পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন, যা মার্কিন রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর একটি মূল স্তম্ভ। ১৮৬৮ সালে গৃহযুদ্ধের পর এটি গৃহীত হয়েছিল, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। এই সংশোধনীতে বলা হয়েছে, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব প্রাপ্ত এবং এর এখতিয়ারাধীন সকল ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং তারা যে রাজ্যে বসবাস করে, সেই রাজ্যের নাগরিক।” ঐতিহাসিকভাবে, এই ধারাটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, মার্কিন ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণকারী যে কোনো শিশুরই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তাদের পিতামাতার আইনি অবস্থা নির্বিশেষে। এটি “জাস সলি” (jus soli) বা “মাটির অধিকার” নীতি নামে পরিচিত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার রাজনৈতিক জীবনে বরাবরই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের কঠোর সমালোচক ছিলেন। তার মতে, এই বিধানটি অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও বসবাসের জন্য একটি প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। তিনি যুক্তি দেন যে, এই নীতি “অ্যাঙ্কর বেবি” (anchor baby) সমস্যার জন্ম দেয়, যেখানে অবৈধ অভিবাসীরা তাদের শিশুদের মার্কিন নাগরিকত্ব লাভের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে তাদের পরিবারের জন্য আইনি সুরক্ষার পথ খুলে দেয়। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিনি একাধিকবার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে অথবা আইনি ব্যাখ্যা পরিবর্তনের মাধ্যমে এই বিধান বাতিল বা সীমিত করার চেষ্টা করেছিলেন, যা তার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অভিবাসন নীতি ছিল।

সম্প্রতি, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের এমন কিছু পদক্ষেপ বা বিধিনিষেধ বাতিল করে দিয়েছে যা জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। যদিও সুনির্দিষ্ট মামলার বিবরণ জনসমক্ষে সম্পূর্ণভাবে আসেনি, তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায় যে, আদালত সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে অক্ষুণ্ণ রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত সীমাবদ্ধতাগুলোকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। এই রায় সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, কারণ এটি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের মৌলিক অধিকারকে আরও একবার দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় কেবল আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। কিছু বিশ্লেষক এটিকে সাংবিধানিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে এক ভোটের ব্যবধানে রক্ষা পাওয়ার ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর অর্থ হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালতের মধ্যে তীব্র মতভেদ ছিল এবং সামান্য ভিন্ন সিদ্ধান্তে মার্কিন সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারতো। আদালতের এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির জন্য একটি বড় পরাজয়, যা তার নির্বাচনী প্রচারাভিযানের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল।

আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর, ট্রাম্প এখন কংগ্রেসকে এই বিষয়ে আইন প্রণয়নের জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে, মার্কিন সংবিধান সংশোধন করা একটি অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সংবিধানের আর্টিকেল V অনুসারে, একটি সংশোধনী প্রস্তাবকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের মাধ্যমে পাস হতে হবে এবং এরপর তিন-চতুর্থাংশ অঙ্গরাজ্যের আইনসভা কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত উচ্চ বাধা, যা সহজে অতিক্রম করা সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র। ট্রাম্পের এই আহ্বান তার সমর্থকদের মধ্যে সমর্থন জোগাবে, কিন্তু কংগ্রেসের উভয় কক্ষে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘকাল ধরে একটি মেরুকৃত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রক্ষণশীলরা প্রায়শই এর সীমাবদ্ধতা বা বাতিলের পক্ষে যুক্তি দেন, যেখানে উদারপন্থীরা এটিকে মৌলিক মানবাধিকার এবং দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির প্রতীক হিসেবে দেখেন। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ রায় এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে আদালত সংবিধানের মূল চেতনাকে সমুন্নত রেখেছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আহ্বান এই বিতর্ককে আরও উস্কে দেবে এবং আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হবে।

এছাড়াও

দোহার কূটনৈতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান: পরোক্ষ আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির সম্ভাবনা

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *