নিজস্ব প্রতিনিধি: পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ডিএনসিসির ঈদ আনন্দ উৎসব ধর্ম-বর্ণ ও দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।
বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) সকালে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে দিয়াবাড়ি সংযোগ সড়ক ও নতুন ১৮ওয়ার্ড প্রকল্পের অন্তর্গত উত্তরা আজমপুর কাঁচা বাজার হতে চামুরখান পর্যন্ত রাস্তার উদ্বোধনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেছেন।
উল্লেখ্য, মিরপুর ডিওএইচএস থেকে উত্তরা দিয়াবাড়ি সংযোগ সড়কটির (উত্তরা দক্ষিণ মেট্রোরেল) দৈর্ঘ্য ৮৭০মিটার, প্রস্থ ৯.১৫মিটার। এবং উত্তরা আজমপুর কাঁচা বাজার হতে চামুরখান পর্যন্ত সম্পন্ন রাস্তার দৈর্ঘ্য ৩.৬কি.মি., প্রস্থ ৩০ফুট।
শুরুতে মিরপুর মিরপুর ডিওএইচএস থেকে উত্তরা দিয়াবাড়ি সংযোগ সড়কটি উদ্বোধন শেষে ডিএনসিসি প্রশাসক দুটি বৃক্ষরোপণ করে রাস্তার দুই পাশে সবুজায়ন কাজের উদ্বোধন করেন।
ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেসব জায়গায় জনদুর্ভোগ হচ্ছে সেসব জায়গায় অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করবো। সেই অনুযায়ী এক নম্বর অগ্রাধিকারে ছিল উত্তরা থেকে মিরপুর-১২ (মিরপুর ডিওএইচএস) নাম্বার যাওয়ার রাস্তাটি। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম রোজার মধ্যেই রাস্তাটির কাজ সম্পন্ন করবো। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঈদের আগে ঈদের উপহার হিসেবে উত্তরা থেকে মিরপুর-১২ (মেট্রোরেলের নিচ দিয়ে মিরপুর ডিএএইচএস) যাওয়ার রাস্তাটির কাজ সম্পন্ন করে উদ্বোধন করলাম। ঈদে অনেকে এখানে ঘুরতে আসবে। মানুষ যেন আনন্দে ও নির্বিঘ্নে ঘুরতে আসতে পারে সেটি মাথায় রেখেই রাস্তাটি নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাস্তাটি জলাধারের উপর দিয়ে গিয়েছে। জনগণের দুর্ভোগ লাঘব করতেই আমরা সাময়িকভাবে এই রাস্তাটি দ্রুত সময়ের মধ্যে করে দিয়েছি। ডিএনসিসির কর্মীরা দিনরাত পরিশ্রম করার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। জলাধারের পানির প্রবাহ বজায় রাখতে ভবিষ্যতে উঁচু ব্রিজ করে স্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করা হবে। জনগণের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে আমরা সাময়িকভাবে রাস্তাটি নির্মাণের জন্য ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কাছে আবেদন করি। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডকে ধন্যবাদ সদয় অনুমোদনের জন্য। তাদের সহযোগিতায় ঈদের আগেই রাস্তাটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি।’
‘রাস্তাটি আগে এক লেনের ছিল বর্তমানে দুই লেন করা হয়েছে। রাস্তার দুইপাশে সবুজায়নের জন্য বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। জনগণকে ভালো কাজ উপহার দিতে আমরা নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি’ বলে যোগ করেন ডিএনসিসি প্রশাসক।
নতুন ওয়ার্ডে প্রয়োজন বেশি তাই সেখানে উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রশাসক বলেন, ‘৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে ডিএনসিসি গঠিত হয়েছে। পরবর্তীতে ১৮টি ওয়ার্ড নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে। নতুন ১৮টি ওয়ার্ড আসলে গ্রাম, তেমন উন্নয়ন অবকাঠামো হয়নি। আমি দায়িত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ঢাকাকে একটি ন্যায্য শহর হিসেবে গড়ে তুলবো। ন্যায্য শহর গড়তে হলে সেসব জায়গায় বেশি উন্নয়ন ও ইনভেস্টমেন্ট করতে হবে যেসব জায়গায় প্রয়োজন বেশি। যেখানে প্রয়োজন কম, সেখানে ইনভেস্টমেন্ট কম হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি সবসময় যেসব জায়গায় পয়সাওয়ালারা, প্রভাবশালীরা বেশি থাকে সেসব জায়গায় বেশি ইনভেস্টমেন্ট হয়েছে। সেসব জায়গা বেশি সুন্দর করার জন্য সবাই ঝাপিয়ে পড়তো। কিন্তু আমি চাই যেসব জায়গায় প্রয়োজন বেশি সেসব জায়গায় বেশি উন্নয়ন ও ইনভেস্টমেন্ট করতে হবে৷’
তিনি আরও বলেন, ‘হিসাব অনুযায়ী নতুন ১৮টি ওয়ার্ডে প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তাই নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের উন্নয়নে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এয়ারর্পোট থেকে দক্ষিণখান ঢাকার পূর্ব-পশ্চিমের যে সংযোগ সড়ক সেগুলোর কাজ চলমান। আজমপুর কাঁচাবাজার থেকে চামুরখান ব্রিজ পর্যন্ত ৩.৬ কিমি প্রধান সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, আজকে উদ্বোধন করে দিচ্ছি। ঈদের পরেই এয়ারপোর্ট থেকে কাউলা সড়কটিও সম্পন্ন হয়ে যাবে।’
প্রশাসক বলেন, ‘নতুন ১৮ ওয়ার্ড এলাকায় মানুষের অনেক ভোগান্তি হয়েছে। ভাড়াটিয়ারা চলে যেতো বাসা ছেড়ে, এমনকি বাড়িওয়ালারাও থাকতে চাইতো না। নতুন এলাকায় অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই এলাকায় কোন প্লান ছিল না। মানুষ রাস্তার জায়গা না ছেড়ে অপরিকল্পিতভাবে বাড়ি বানিয়েছে। আমাদের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে উঠান বৈঠক করে রাস্তার জন্য জায়গা ছাড়ার অনুরোধ করেছে। তাদেরকে বুঝিয়েছে রাস্তা প্রশস্ত হলে অনেক সুবিধা হবে, নির্বিঘ্নে এম্বুলেন্স চলতে পারবে। এভাবে কিছুটা প্রশস্ত হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে ৭০ফুট প্রশস্ত রাস্তা করতে হবে এই এলাকায়। মাস্টারপ্লান আছে, সেভাবে ভবিষ্যতে করা হবে যেন পুরো অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়।’
সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে প্রধান সড়কগুলোর মেরামত প্রায় শেষ করেছি। সব প্রধান সড়কের Potholes (গর্ত) মেরামত করে উঁচু নিচু রাস্তা সমান করা হয়েছে। পাঁচ আগস্টের পর অনেক ঠিকাদার পালিয়ে গেছে। তাই পিপিআর রুল অনুসরণ করে কাজ করায় কিছুটা সময় প্রয়োজন। পিপিআর স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করায় অলিগলি ও ভিতরের রাস্তাগুলো করতে একটু সময় লাগছে৷ আমাদের লোকবলও খুবই কম। প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ২০শতাংশ লোকবল নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের টিম দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আমি ঈদের পরে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে যাব। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভিতরের রাস্তা নির্বাচন করে দ্রুতই সেগুলোর কাজ করবো।’
সবার অংশগ্রহণে ন্যায্য শহর গড়তে চাই উল্লেখ করে প্রশাসক বলেন, ‘ডিএনসিসির ফেসবুক পেজে দেখতে পাবেন ঢাকার উন্নয়ন বা সেবা নিয়ে সবাই মতামত দেয়, অংশগ্রহণ করে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ সবার অংশগ্রহণে এমন একটি শহর গড়তে চাই যে শহরের নিজস্ব গল্প থাকবে। পুরোনো ঢাকার গল্পগুলো আবার ফিরিয়ে আনতে চাই। ঢাকার জীবন ফিরিয়ে দিতে হবে। এখানে মানু্ষের বসবাসের পাশাপাশি উৎসবের ব্যবস্থা করতে হবে, পরিবেশ ঠিক থাকতে হবে, বাচ্চাদের জন্য খেলার সুযোগ থাকতে হবে, শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকবে, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।’
মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘ঢাকা উত্তরে ডিএনসিসির উদ্যোগে ঈদের জামাতের আয়োজন করা হয়েছে। পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণত ঈদের জামাত শেষে ঢাকায় সবাই গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, বাসায় থেকে ঈদের দিন কাটিয়ে দেয়। আমরা এবার সবাইকে ঈদের উৎসবে যুক্ত করতে চাই। সুলতানী মোঘল আমলে পুরনো ঢাকায় একময় ঈদ মিছিল হতো। সেই পুরোনো ঈদ মিছিল আবার ফিরিয়ে আনতে চাই। এই ঈদ আনন্দ মিছিলে অংশগ্রহণ করবে শিল্পী, সংস্কৃত কর্মী, নারী-পুরুষ, শিশু, সকল ধর্মের, বর্ণের মানুষ। আমরা সবাইকে আহবান জানাচ্ছি দল-মত নির্বিশেষে সবাই ঈদ আনন্দ উৎসবে যোগ দিন। ঈদের জামাত শেষে সকাল ৯টায় পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠ থেকে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঈদ আনন্দ মিছিল শুরু হবে। বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে দিয়ে আগারগাঁও প্রধান সড়ক হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউ দিয়ে সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হবে আনন্দ মিছিল। বর্ণাঢ্য এই আনন্দ মিছিলে ব্যান্ড পার্টি, ঘোড়ার গাড়ি, ঢোল, বাজনাসহ নানা আয়োজন থাকবে। পাশাপাশি এই আনন্দ মিছিলে ঈদ মোবারক লেখা ফেস্টুন প্ল্যাকার্ড থাকবে। পাঁচ আগস্টে সবাই যেমন বিভিন্ন লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিজয় মিছিল করেছেন, তেমনিভাবে আপনারা আপনাদের ম্যাসেজটি নিয়ে আনন্দ মিছিলে অংশগ্রহণ করুন।’
সড়ক উদ্বোধনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান, প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগে. জেনা. মো. মঈন উদ্দিন, ১৮ওয়ার্ডের প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগে. জেনা. মোহাম্মদ ওসমান সরোয়ার, ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান, মো. জুলকার নায়ন ও মো. জিয়াউর রহমান, ১৮ ওয়ার্ড প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল মো. মাসুদুর রহমান খান ও প্রকল্প কর্মকর্তা মেজর এস সৌমিক ইসলাম প্রমুখ।