রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ঘুমের ওষুধ সেবনের পর আদ দ্বীন (২৩) নামের এক তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রবিবার দিবাগত রাতে শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মৃতের ক্ষুব্ধ স্বজনেরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেন এবং ভাঙচুরের উপক্রম হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা হাসপাতালের নিরাপত্তা ও চিকিৎসার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আদ দ্বীন নামের ওই যুবক গত রবিবার রাতে অতিরিক্ত মাত্রায় ঘুমের ওষুধ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা তাঁকে বাসায় ফেরত পাঠান। তবে, বাসায় ফেরার পর আদ দ্বীনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা তাঁকে পুনরায় শ্যামলী এলাকার সিটি কেয়ার নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, যুবকটিকে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃতের স্বজনেরা অভিযোগ করছেন, ভুল চিকিৎসার কারণেই আদ দ্বীনের মৃত্যু হয়েছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে। হাসপাতালের চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল নথি এবং চিকিৎসকদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মৃতের স্বজনদের অভিযোগ, সিটি কেয়ার হাসপাতালে আদ দ্বীনকে ভর্তির পর থেকে তাঁর চিকিৎসায় অবহেলা করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় এবং চিকিৎসকদের গাফিলতির কারণেই আদ দ্বীনের প্রাণহানি ঘটেছে। এই অভিযোগের পর হাসপাতালের অভ্যন্তরে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। স্বজনেরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে হাসপাতাল কর্মীদের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি এমন দিকে মোড় নিচ্ছিল যে, যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারত। পুলিশের সময়োচিত হস্তক্ষেপেই বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ঘুমের ওষুধের অপব্যবহার এবং এর ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন। মানসিক চাপ, হতাশা, বা অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ঘুমের ওষুধ সেবন করেন, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে। আদ দ্বীনের এই অকালমৃত্যু সমাজে ঘুমের ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবের বিষয়টি পুনরায় সামনে এনেছে। চিকিৎসকদের মতে, ঘুমের ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং নির্ধারিত মাত্রা অতিক্রম করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
এই ঘটনার তদন্তে পুলিশের পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেও একটি কমিটি গঠন করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভুল চিকিৎসার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে, পরিবারের পক্ষ থেকে আদ দ্বীনের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। এই ঘটনা রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবা খাতের জবাবদিহিতা এবং রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
তদন্তকারীরা আদ দ্বীনের শেষ মুহূর্তের চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল তথ্য সংগ্রহ করছেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক চিকিৎসার তথ্য এবং সিটি কেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে দেওয়া চিকিৎসার বিস্তারিত বিবরণ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি রাজধানী ঢাকার জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় সকলে তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
