Monday , June 29 2026
Breaking News
বিদেশি মাতবরি ও প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদের নতুন উত্থান: মধ্য ইউরোপের দৃষ্টান্ত

বিদেশি মাতবরি ও প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদের নতুন উত্থান: মধ্য ইউরোপের দৃষ্টান্ত

আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিশ্বায়ন ও উদার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষের ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা জাতিগত জাতীয়তাবাদ ও স্বৈরাচারী প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে। তবে, বাস্তব চিত্রটি আরও জটিল ও বহুস্তরীয়। মানুষ কেবল রাগ বা ভয় থেকে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না; বরং অর্থনৈতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত অস্থিরতা, সাংস্কৃতিক উদ্বেগ এবং জাতীয় পরিচয়ের গভীর প্রশ্ন—এইসব মিলিয়েই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হচ্ছে। এর ফলে কোথাও জাতীয়তাবাদ জোরদার হচ্ছে, আবার কোথাও মানুষ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা রক্ষায় এগিয়ে আসছে।

প্রযুক্তি ও অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অতীতের দিকে ফিরে তাকায়। এই অতীত চেতনা বা নস্টালজিয়া কখনো জাতিগত জাতীয়তাবাদীদের শক্তি জোগায়, আবার কখনো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দেশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে দুবার উত্থানকে ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি একদিকে নিজেকে বিশ্বায়নের বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করেন, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে নানা চুক্তি করতে থাকেন—এই দ্বৈত আচরণ অনেককে বিভ্রান্ত করে। এই রাজনৈতিক ধাঁধার সূত্র খুঁজতে গেলে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দিকে তাকাতে হয়। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে এই অঞ্চল এক বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছিল, যা বিংশ শতাব্দীর শেষের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভূমিকম্পগুলোর অন্যতম। তখন মানুষ উদারনীতি, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ—এই তিনের মিশ্র ধারণাকে সামনে রেখে সোভিয়েত আমলের আন্তর্জাতিক কমিউনিজমকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

আজ সেই মধ্য ও পূর্ব ইউরোপই নতুন এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এখানে জাতীয়তাবাদ এখন কেবল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেই নয়, বরং বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধেও এক প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট দুটি উদাহরণ সম্প্রতি দেখা গেছে: হাঙ্গেরির নির্বাচনে ভিক্তর অরবানকে চ্যালেঞ্জ করে পেতের মাগিয়ারের উত্থান এবং আলবেনিয়ায় সাজান দ্বীপকে বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরের ট্রাম্প পরিবারের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জনতার প্রতিবাদ। মাগিয়ারের সাফল্যের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও তিনি জাতীয় পরিচয়, দুর্নীতি ও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়গুলোকে জোর দিয়ে সামনে এনেছিলেন। উল্লেখ্য, ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং টাকার কার্লসনের মতো ডানপন্থী মার্কিন নেতারা হাঙ্গেরিকে ব্যবহার করে তাদের ‘মাগা’ (MAGA) আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। একই সময়ে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও ছিল লক্ষণীয়। নির্বাচনের আগের দিন হাঙ্গেরির মানুষ ১৯৫৬ সালের সোভিয়েতবিরোধী আন্দোলনের পুরোনো স্লোগান, ‘রুশরা ফিরে যাও’, আবার সগৌরবে উচ্চারণ করে।

অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় ভিন্ন ধরনের প্রতিবাদ দেখা গেছে। ইভাঙ্কা ট্রাম্প ও জ্যারেড কুশনার সাজান দ্বীপে বিলাসবহুল সমুদ্রতট রিসোর্ট এবং পিশে পোরো-নার্তা উপকূলীয় সংরক্ষিত বনভূমিতে উন্নয়ন–পরিকল্পনা হাতে নিতে চেয়েছিলেন। অনেকের কাছে এটি ট্রাম্পের সেই বিতর্কিত প্রস্তাবের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে গাজাকে ধনী পর্যটকদের জন্য বিলাসবহুল সমুদ্রতট বানানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আলবেনিয়ার জনগণ এই পরিকল্পনা মেনে নেয়নি। তাদের মতে, ধনীদের জন্য তৈরি পর্যটন প্রকল্প দেশের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ। উন্নয়ন এমন হওয়া উচিত, যা সাধারণ মানুষের উপকারে আসে, কোনো একক শিল্পের শোষণের পথ খুলে দেয় না। এই ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, দুর্নীতি ও বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে যে নতুন ধরনের গণ–আন্দোলন গড়ে উঠছে, তা আগের আক্রমণাত্মক জাতিগত জাতীয়তাবাদ থেকে ভিন্ন।

এই প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী মাসে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে ষোড়শ শতাব্দীর লিথুয়ানিয়ার গ্র্যান্ড ডাচির কিছু রাজমুকুট প্রদর্শিত হবে, যা সম্প্রতি পুনরায় খুঁজে পাওয়া গেছে। একসময় এই রাজ্য বাল্টিক অঞ্চল থেকে বর্তমান ইউক্রেন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই প্রদর্শনীতে পোল্যান্ডের রাজা ও লিথুয়ানিয়ার গ্র্যান্ড ডিউক আলেক্সান্ডার ইয়াগিয়েলন এবং হাঙ্গেরির একাদশ শতাব্দীর সেন্ট স্টিফেনের মুকুটের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো একটি যৌথ অতীতের প্রতীক হিসেবে সামনে আনা হবে। পেতের মাগিয়ারের ক্ষেত্রেও ইতিহাসের এই প্রতীকী ব্যবহার স্পষ্ট। তিনি সেন্ট স্টিফেনের মুকুটকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পার্লামেন্ট ভবনের ডোম হলে সেই মুকুটের সামনে তাঁর প্রার্থনার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি প্রস্তাব করেন যে, নতুন সংসদ সদস্যদের ওই মুকুটের সামনে দাঁড়িয়ে শপথ নিতে হবে। এই মুকুট হাঙ্গেরির ইতিহাসে গভীর অর্থ বহন করে, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ছোট ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি হিসেবে যৌথ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সামনে আনছে। এই ইতিহাসই তাদের এমন এক শক্তি দিচ্ছে, যার সাহায্যে তারা বিদেশি জাতীয়তাবাদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের মোকাবিলা করতে পারছে। এই বাস্তবতায়, মধ্যযুগীয় সেই আসল মুকুটগুলো, যেগুলোর এখনো গভীর রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে, তা সত্যিকারের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। আর তার পাশে ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বদের ঝলমলে কিন্তু বাহুল্যপূর্ণ প্রতীকগুলো খুব একটা গুরুত্ব পায় না, যা বিদেশি প্রভাব প্রতিরোধের এই নতুন ধারার জাতীয়তাবাদের মূল বার্তা।

এছাড়াও

যুক্তরাষ্ট্রে টিপিএস অভিবাসীদের সামনে নতুন বিপদ: স্থায়ী বসবাসের অনুমতি না পেলে দেশে ফেরার প্রস্তাব

যুক্তরাষ্ট্রে টিপিএস অভিবাসীদের সামনে নতুন বিপদ: স্থায়ী বসবাসের অনুমতি না পেলে দেশে ফেরার প্রস্তাব

যুক্তরাষ্ট্রে টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) বা অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদায় বসবাসরত হাজার হাজার অভিবাসী এখন এক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *